সব সংবাদ
খেলা

জিদানের অমরত্ব: অপমান থেকে ফ্রান্সের সোনালি স্বর্গে

আলজেরিয়ান দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান অপমান ও সংশয় পেরিয়ে ফুটবল মাঠে অমরত্ব লাভ করেন। ১৯৯৩ সালের কালো দিন থেকে শুরু করে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ জয় — জিদান ফ্রান্সের ভাগ্য বদলে দেন।

ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে এক সময় এমনও হয়েছিল যখন জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ছিল সবার মনে। ১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর পার্ক দে প্রিন্সেসে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে হেরে ফ্রান্স ১৯৯৪ বিশ্বকাপের টিকিট হারায়। সেই ধাক্কা এতটাই ভারী ছিল যে কোচ জেরার হুলিয়ে পদত্যাগ করে যান। জাতীয় দল ভেঙে পড়ে, সমর্থকদের আস্থা তলানিতে নামে। তবে ফ্রান্সের পুনর্জাগরণের বীজ বপন হয় ১৯৯৪ সালের আগস্টে। চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ২২ বছর বয়সী জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের অভিষেক হয়। বদলি হিসেবে নেমে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে তিনি পিছিয়ে থাকা ফরাসিদের ড্র এনে দেন। সেই মুহূর্ত থেকেই ফ্রান্সের সমর্থকরা নতুন আশার আলো খুঁজে পায়।

জিদানের যাত্রা কিন্তু সহজ ছিল না। অভিষেকে ঝলক দেখালেও জাতীয় দলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ১৯৯৬ ইউরোতেও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন। পরে জানা যায়, টুর্নামেন্টের আগে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হয়েও খেলেছিলেন তিনি। কোচ আইমে জ্যাক কিন্তু সমালোচনার মুখেও জিদানের ওপর আস্থা হারাননি। তিনি বুঝেছিলেন, ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ গড়তে হলে জিদানকে কেন্দ্র করেই দল সাজাতে হবে। তাই সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। আগের প্রজন্মের বড় তারকা এরিক কান্তোনা, ডেভিড জিনোলা ও জ্যঁ-পিয়ের পাপাঁকে দল থেকে সরিয়ে দেন। তার পরিকল্পনা ছিল শক্তিশালী রক্ষণভাগ, কঠোর দলীয় শৃঙ্খলা এবং জিদানকে ঘিরে সৃজনশীল ফুটবল গড়ে তোলা।

জিদানের সঙ্গে ইয়োরি ইয়র্কায়েফের জুটি দ্রুতই ফ্রান্সের আক্রমণের মূল শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ৩৪ ম্যাচ খেলে একটিও হারেননি। তবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে জিদানের যাত্রা ছিল নাটকীয়। সৌদি আরবের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখে দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ হন তিনি। ফ্রান্স যদি প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে হেরে যেত, তাহলে জিদান হয়তো জাতীয় খলনায়কে পরিণত হতেন। কিন্তু লরঁ ব্লঁ'র 'গোল্ডেন গোল' ফ্রান্সকে বাঁচিয়ে দেয় এবং তৈরি করে জিদানের প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ।

১৯৯৮ সালের ১২ জুলাই, স্তাদে দ্য ফ্রান্সে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে জিদান নিজেকে অমর করে তোলেন। কর্নার থেকে জোড়া হেডে গোল করে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন তিনি। পরে ইমানুয়েল পেতির আরেক গোলে ৩-০ ব্যবধানে জিতে ফ্রান্স ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে। সেই রাতে জিদান ফ্রান্সের সর্বকনিষ্ঠ বীর হয়ে উঠেন।

জিদানের ব্যক্তিগত যাত্রাও কম নাটকীয় নয়। ফ্রান্সের মার্সেইতে এক দরিদ্র আলজেরিয়ান পরিবারে জন্ম নেওয়া জিদানের বাবা ছিলেন একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের নাইটওয়াচম্যান। পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ জিদান পাঁচ বছর বয়সেই স্থানীয় ক্লাবে খেলা শুরু করেন। তার প্রতিভা নজরে আসে এএস কান ক্লাবের রিক্রুটার জিন ভ্যারার্ডের। মাত্র ছয় সপ্তাহ থাকার উদ্দেশে কান শহরে গেলেও জিদান সেখানে কাটিয়ে দেন চার বছর। তার অসাধারণ পারফরম্যান্সে এএস কান প্রথমবারের মতো উয়েফা কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

১৯৯২ সালে জিদান যোগ দেন বোর্দো ক্লাবে। সেখানে ১৯৯৪ সালে মৌসুমের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন এবং ১৯৯৫ সালে জেতেন উয়েফা ইন্টারটোটো কাপ। ১৯৯৬ সালে নিউক্যাসল ইউনাইটেড জিদানকে দলে নিতে আগ্রহ দেখালেও পরে প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয় — বলা হয়েছিল প্রিমিয়ার লিগের গতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মতো ফিট নন তিনি। ওই বছরেই জিজু যোগ দেন ইতালির জুভেন্তাসে। সেখানে কোচ মার্সেলো লিপ্পির অধীনে জিদান দ্রুতই দলের মূল ভরসায় পরিণত হন। তার নেতৃত্বে জুভেন্তাস টানা দুই মৌসুম সিরি আ জেতে এবং সেরা বিদেশি খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন এই ফরাসি মিডফিল্ডার।

২০০১ সালে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি-তে জিদান যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। সেখানে তিনি একটি লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ ছয়টি শিরোপা জেতেন। বিশেষ করে ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে তার বিখ্যাত বাঁ-পায়ের ভলি গোল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে জিদান ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ ও ইউরো জিতেছেন। তার সুযোগ ছিল আলজেরিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করার। কিন্তু তৎকালীন কোচ তাকে 'যথেষ্ট গতিসম্পন্ন নন' বলে দলে নিতে অস্বীকৃতি জানান। সেই জিদান নিজের দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অসাধারণ কৌশলী ফুটবল দিয়ে সব সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে নিয়েছিলেন।

ব্যক্তিগতভাবে জিদান ১৯৯৮ সালে ব্যালন ডি'অর এবং তিনবার (১৯৯৮, ২০০০, ২০০৩) ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। কোচ হিসেবেও সফল ছিলেন ফরাসি এই বিশ্বকাপজয়ী তারকা। রিয়াল মাদ্রিদের ম্যানেজার হিসেবে আধুনিক ফুটবল ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র কোচ হিসেবে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৬, ২০১৭, ২০১৮) ট্রফি রয়েছে তার ঝুলিতে। জিদানের ক্যারিয়ার প্রমাণ করে, প্রকৃত চ্যাম্পিয়নরা দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপ দিতে জানেন।