সব সংবাদ
আন্তর্জাতিক

চুরির রহস্য: কীভাবে মোনালিসা বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি হয়ে উঠল

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা একসময় ল্যুভর মিউজিয়ামের হাজার হাজার ছবির মধ্যে একটি সাধারণ পোর্ট্রেট ছিল। কিন্তু ১৯১১ সালে এক দুঃসাহসিক চুরি এই সাধারণ ছবিকে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে তারকায় পরিণত করে।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি 'মোনালিসা' বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম। এর রহস্যময় হাসি আজ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও, একসময় এটি ল্যুভর মিউজিয়ামের অনেক সাধারণ ছবির একটি ছিল। দর্শনার্থীরা এটি প্রায়ই উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে যেত।

১৯১১ সালের ২০ আগস্ট রোববার সন্ধ্যায় প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে ঘটে যায় এক অবাক করণীয়। ২৯ বছর বয়সী ইতালীয় শ্রমিক ভিনসেঞ্জো পেরুজা মিউজিয়ামের একটি সরবরাহ কক্ষে লুকিয়ে ছিলেন। তিনি মিউজিয়ামের সুরক্ষা কাজে সাহায্য করতেন, তাই ভেতরের অনেক কিছু তার জানা ছিল।

পরের দিন সকালে মিউজিয়াম বন্ধ থাকলে তিনি তার সাদা কাজের পোশাক পরে বেরিয়ে আসেন এবং মোনালিসাকে দেয়াল থেকে নামিয়ে নেন। সিঁড়ির কাছে গিয়ে ফ্রেম খুলে কাঠের প্যানেলটি নিজের পোশাকের নিচে লুকিয়ে রাখেন। পালানোর সময় একটি দরজা বন্ধ থাকায় সমস্যা হয়, কিন্তু একজন প্লাম্বার তাকে সহকর্মী ভেবে দরজা খুলে দেন। এভাবে তিনি মোনালিসাকে নিয়ে মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে যান।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কেউ টের পায়নি ছবিটি চুরি গেছে। ছবি পরিষ্কার বা স্কেচ করার জন্য প্রায়ই ছবি নামানো হতো, তাই ফাঁকা দেয়াল দেখে কেউ সন্দেহ করেনি। মঙ্গলবার দুপুরে চিত্রকর লুই বেরো ছবিটি স্কেচ করতে এসে দেখেন দেয়াল ফাঁকা।

এরপর শুরু হয় হুলস্থুল। খবরটি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্যারিসজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ৬০ জন গোয়েন্দাকে তদন্তে নিয়োগ করা হয়। সন্দেহভাজন হিসেবে বিখ্যাত কবি গিয়ম অ্যাপোলিনেয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার সূত্র ধরে পাবলো পিকাসোকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তবে প্রমাণের অভাবে দুজনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়।

চুরির পর মোনালিসা হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক তারকা। মানুষ শুধু সেই ফাঁকা দেয়ালটি দেখার জন্যই ল্যুভরের বাইরে লাইন ধরতে শুরু করে। শিল্প ইতিহাসবিদদের মতে, অন্য কোনো চিত্রকর্ম চুরি গেলে সেটিই হয়তো আজ বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত হতো।

প্রায় দুই বছর পেরুজা মোনালিসাকে তার প্যারিসের অ্যাপার্টমেন্টের একটি কাঠের ট্রাঙ্কে পুরোনো কাপড়ের নিচে লুকিয়ে রাখেন। ১৯১৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি ইতালির ফ্লোরেন্সের এক আর্ট ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছবি বিক্রি করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেছিলেন, নেপোলিয়ন ইতালি থেকে ছবি চুরি করেছিলেন এবং দেশপ্রেমিক হিসেবে সম্পদ ফিরিয়ে আনাই তার লক্ষ্য। কিন্তু আদালতে প্রমাণিত হয় যে তিনি আর্থিক লাভের আশায় ছবি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। তাকে গ্রেপ্তার করে ৭ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ইতালিতে অনেকে তাকে জাতীয় বীর হিসেবে সম্মান জানিয়েছিল।

১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে মোনালিসা ল্যুভরে ফিরে আসে। প্রথম দুইদিনেই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ ছবিটি দেখতে ভিড় করে। ভিনসেঞ্জো পেরুজার সেই দুঃসাহসিক চুরিই একটি সাধারণ মাস্টারপিসকে আজকের তুমুল জনপ্রিয় গ্লোবাল আইকনে পরিণত করেছে।