বিশ্বজুড়ে সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীদের জন্য বেক্সিমকোর সাশ্রয়ী 'ট্রিকো'
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস সিস্টিক ফাইব্রোসিসের জেনেরিক ওষুধ 'ট্রিকো' বাজারে এনেছে। মূল ওষুধ ট্রিকাফটার তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কম দামে এই ওষুধ বিশ্বজুড়ে রোগীদের নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সিস্টিক ফাইব্রোসিস (সিএফ) চিকিৎসায় ব্যবহৃত বেক্সিমকো ফার্মার স্বল্পমূল্যের ওষুধ 'ট্রিকো' নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মূল ব্র্যান্ডের তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কম দামের এই ওষুধটি বিশ্বজুড়ে সিএফ রোগীদের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
গত সপ্তাহে ঢাকার অদূরে টঙ্গীতে অবস্থিত বেক্সিমকো ফার্মার উৎপাদন কারখানায় ছয়টি দেশের সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগী ও তাদের পরিবারের প্রতিনিধিদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ওষুধটি তুলে দেওয়া হয়। 'A Loophole Brings Cystic Fibrosis Patients a Miracle Drug in Generic Form' শীর্ষক প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশের ওষুধশিল্প, বিশেষ করে বেক্সিমকো ফার্মার এ উদ্যোগকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় ওষুধপ্রাপ্তির প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনটিতে দক্ষিণ আফ্রিকা, স্লোভাকিয়া এবং বাংলাদেশের রোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে জীবনরক্ষাকারী ওষুধপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বৈষম্য এবং সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেক্সিমকোর ভূমিকা আলোচিত হয়েছে।
সিস্টিক ফাইব্রোসিস একটি জটিল ও প্রাণঘাতী জিনগত রোগ। মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভার্টেক্স ফার্মাসিউটিক্যালসের উদ্ভাবিত ট্রিকাফটা (Trikafta) বিশ্বব্যাপী সিএফ চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনলেও এর উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের অধিকাংশ রোগীর নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রিকাফটার এক বছরের চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার মার্কিন ডলার।
এই প্রেক্ষাপটে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ট্রিকাফটার জেনেরিক সংস্করণ 'ট্রিকো' বাজারে এনেছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মেধাস্বত্ববিষয়ক বিধানের বিশেষ ছাড় কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ওষুধটি রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুদের জন্য ট্রিকোর বার্ষিক চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৩৫০ মার্কিন ডলার এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রায় ১২ হাজার মার্কিন ডলার। মূল ওষুধের তুলনায় এ মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কম। যদিও এটি এখনও অনেক পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল, তবুও হাজারো রোগীর জন্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ার একটি বাস্তবসম্মত সুযোগ তৈরি করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস দক্ষিণ আফ্রিকার জোশুয়া লটারিং, স্লোভাকিয়ার শিমন সেভচিক এবং বাংলাদেশের শিশু আদিল রহমানের গল্প তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, কীভাবে তারা বা তাদের পরিবার বাংলাদেশে এসে ট্রিকো সংগ্রহ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই নিজ দেশে ওষুধটির অনুমোদন বা আর্থিক সহায়তা না থাকায় রোগীরা বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রাব্বুর রেজার বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি জীবনরক্ষাকারী ও উদ্ভাবনী ওষুধের সাশ্রয়ী সংস্করণ তৈরি করে স্বাস্থ্যসেবায় বৈশ্বিক বৈষম্য কমাতে বেক্সিমকোর অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হেপাটাইটিস সি এবং কোভিড-১৯সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রোগের স্বল্পমূল্যের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বেক্সিমকোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ট্রিকোকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যে প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প শুধু দেশের চাহিদা পূরণেই নয়, বরং উন্নয়নশীল বিশ্বের রোগীদের জন্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সহজলভ্য করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ট্রিকোর মাধ্যমে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীদের জন্য এমন একটি চিকিৎসা বিকল্প তৈরি করেছে, যা বহু পরিবারের কাছে নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস বেক্সিমকোর এ উদ্যোগকে শুধু একটি ব্যবসায়িক সাফল্য হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসমতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবদানের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবেও তুলে ধরেছে।