সব সংবাদ
জাতীয়

ত্রাণ তহবিলের নামে কোটি টাকার পণ্য পাচারের চেষ্টা: বেনাপোলে ৩ জন আটক

বেনাপোল স্থলবন্দরের কাস্টমস গোডাউন থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর কথা বলে কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল। এই ঘটনায় বিজিবি অভিযান চালিয়ে একটি কাভার্ডভ্যানসহ তিনজনকে আটক করেছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর কথা বলে কোটি টাকার উচ্চ শুল্কের ভারতীয় পণ্য পাচারের চেষ্টার অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অভিযান চালিয়ে একটি কাভার্ডভ্যান বোঝাই পণ্য জব্দ করার পর ঘটনার সঙ্গে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। এ ঘটনায় কাস্টমসের দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ও তিন সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা এবং বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে যাত্রীদের কাছ থেকে জব্দ করা ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য কাস্টমসের গোডাউনে সংরক্ষিত ছিল। সরকারি বিধি অনুযায়ী এসব পণ্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছিল। অভিযোগ উঠেছে, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ত্রাণ তহবিলের পণ্যের আড়ালে উচ্চ শুল্কের বাণিজ্যিক মালামাল গোডাউন থেকে বের করে পাচারের চেষ্টা করে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার (২২ জুন) দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে বেনাপোল বাজার এলাকায় অভিযান চালায় বেনাপোল বিজিবি কোম্পানির সদস্যরা। এ সময় ঢাকা মেট্রো-ট ২৪-৫৬২১ নম্বরের একটি কাভার্ডভ্যান আটক করা হয়। গাড়িটি থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য উদ্ধার করা হয়। অভিযানের সময় কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শ্রী ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী (৩৮), কাভার্ডভ্যানের চালক মো. মহসিন আলী (৩৪) এবং হেলপার মো. জাহিদ হাসান (২১)-কে আটক করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া চালানটিতে উচ্চ শুল্কের ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কসমেটিকস এবং আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় ওষুধ ছিল। এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। তবে পণ্যের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও সিজারমূল্য নির্ধারণে কাজ চলছে।

বিজিবি সূত্র জানায়, জব্দকৃত পণ্যগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং কীভাবে সেগুলো কাস্টমসের সংরক্ষিত গোডাউন থেকে বের করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে একটি কাভার্ডভ্যানসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মালামালের হিসাব ও সিজারমূল্য নির্ধারণের কাজ চলছে। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

ঘটনার পর বেনাপোলের ব্যবসায়ী মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক লতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ পণ্য পাচারের চেষ্টা করে থাকে, তাহলে এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেনাপোলে একের পর এক পণ্য চুরি, শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা ও জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসছে। এবার ত্রাণ তহবিলের আড়ালে পণ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কর্মকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বেনাপোল বন্দরে একাধিক অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে কাস্টমসের জব্দ করা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় পণ্য উধাও হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এছাড়া ৪১ নম্বর শেড থেকে প্রায় ২৫ টন আমদানিকৃত পণ্য নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগেও তদন্ত চলছে। এর আগে ২৬ নম্বর শেড থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের ঘোষণাবহির্ভূত ভারতীয় শাড়ি ও কসমেটিকস জব্দ করা হয়।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দুইজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) এবং তিনজন সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় তদন্ত চলছে। তদন্তে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।