সব সংবাদ
জাতীয়

ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালুর দাবি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উপেক্ষিত

পাবনার ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালুর দাবি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঈশ্বরদী ইপিজেডসহ বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত বিমানবন্দরটি চালুর দাবি বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঈশ্বরদী ইপিজেড, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক ডাল ও কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালনশাহ সেতুর নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্র এবং কৃষিভিত্তিক শক্তিশালী অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে আছে।

বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও, এ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, ১৯৬২ সালে ৪৩৬.৬৫ একর জমির ওপর ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু করা হয়। এর রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৭০০ ফুট এবং প্রস্থ ৭৫ ফুট। ১৯৯০ সালের ৫ এপ্রিল প্রথমবারের মতো বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৯৪ সালের ১৭ জুলাই পুনরায় বিমান চলাচল শুরু হয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৩ নভেম্বর আবারো বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর পুনরায় ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা শুরু করে।

সে সময় সপ্তাহে প্রতি শনি ও সোমবার ঢাকা-ঈশ্বরদী-ঢাকা রুটে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ফ্লাইট পরিচালনা করত। এই রুটে ইউনাইটেড এয়ারের ৩৭ আসনের 'ড্যাশ-৮-১০০' মডেলের উড়োজাহাজ যাতায়াত করত। তখন একমুখী ভাড়া ৪ হাজার টাকা ও দ্বিমুখী ভাড়া ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পরেই লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে ২০১৪ সালের ২৩ এপ্রিল আবারো বিমান ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়।

অদ্যাবধি বিমানবন্দরটিতে সব ধরনের কমার্শিয়াল ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে কোনো শিডিউল ফ্লাইট না থাকলেও অফিশিয়ালি বিমানবন্দরটি সচল রয়েছে এবং এর যোগাযোগ যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত আছে। বিমানবন্দরটির রক্ষণাবেক্ষণসহ সচল রাখার জন্য বিভিন্ন শাখায় বর্তমানে ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। বিমানবন্দরের রানওয়ে, অ্যাপ্রন ও ট্যাক্সিওয়ের সবকিছুই ব্যবহারের উপযোগী রয়েছে বলে তারা জানান।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের ৪৩৬.৬৫ একর জমির মধ্যে বিমানবন্দর সংলগ্ন মিলিটারি ফার্মকে ২৯০.৭৪ একর জমি দেওয়া আছে। বর্তমানে বিমানবন্দরের নিজস্ব আওতায় রয়েছে ১৪৫.৯১ একর জমি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানবন্দরের একজন কর্মচারী জানান, ২০১৪ সাল থেকে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল বন্ধ থাকলেও এখানে বিমান বাহিনী, সেনাবাহিনী ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ানদের বহনকারী কিছু ছোট প্লেন ও হেলিকপ্টার প্রায়ই ওঠানামা করে। তিনি আরও জানান, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরকে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ রূপে চালু করতে হলে রানওয়ে বড় করতে হবে। বর্তমানের ৪ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়েকে বাড়িয়ে অন্তত ৬ হাজার ফুটে উন্নীত করা জরুরি।

পাবনা জেলার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঈশ্বরদী বিমানবন্দর এক সময় দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশপথ যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঈশ্বরদী ইপিজেড, শিল্প ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির কারণে বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু হলে পাবনা, কুষ্টিয়া, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালু হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রুত কৃষিপণ্য পরিবহন, পর্যটন বিকাশ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা না হলে এই উদ্যোগ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ঈশ্বরদীর খাইরুল গ্রুপের স্বত্বাধিকারী শিল্পপতি আলহাজ্ব খাইরুল ইসলাম বলেন, ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ঈশ্বরদী। সেদিক বিবেচনা করেই ১৯৬২ সালে এখানে বিমানবন্দর চালু করা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এটি চালুর দাবি জানাচ্ছি।

ঈশ্বরদী শিল্প ও বণিক সমিতির (চেম্বার অব কমার্স) সভাপতি আশিকুর রহমান নান্নু বলেন, অর্থনীতির দিক থেকে ঈশ্বরদী অনেক আগে থেকেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ইপিজেডসহ নানা ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানের কারণে ঈশ্বরদীতে বিদেশি নাগরিকসহ বিশিষ্ট শিল্পপতিদের প্রতিনিয়ত আসা-যাওয়া করতে হয়। তাই ঈশ্বরদী বিমানবন্দর দ্রুত চালু করা দরকার।

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের সহকারী পরিচালক মোছা. দিলারা পারভীন বলেন, বিমানবন্দর চালুর বিষয়টি সম্পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হলে তবেই বিমান চলাচল শুরু সম্ভব। আমাদের স্থানীয় অফিসে এখনো অনুমোদনের কোনো কাগজপত্র আসেনি। সাধারণত বিমানবন্দর চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে স্থানীয় অফিসে কোনো কাগজ আসে না। তবে টেকনিক্যাল টিম বিভিন্ন সময়ে এসে বিমানবন্দর এলাকা পরিদর্শন করে যাচ্ছে।