বিনিয়োগে বাধা ‘আইনশৃংখলা’
দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলেও আইনশৃংখলার অবনতি অব্যাহত থাকায় বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হচ্ছেন না। চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলির ঘটনাসহ সারাদেশে অপরাধ বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি ও মব সন্ত্রাস বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণতন্ত্র ও অর্থনীতি পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। দীর্ঘ দেড় যুগ পর গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মুক্তি এলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ও বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি অপরিহার্য। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আইনশৃংখলার উন্নতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের পর্যাপ্ততা এবং বিনিয়োগকৃত পুঁজি তুলে আনার নিশ্চয়তা।
নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে বটে; কিন্তু আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ‘বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ’ সৃষ্টি হয়নি। বড় হোটেলের এসি রুমে সেমিনার করে উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে পুঁজি খাটিয়ে মানুষ কি নিরাপদ?
গত ২১ জুন চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকায় একটি পোশাক কারখানার সামনের ৩৭ সেকেন্ডের সিসিটিভি ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, পাঁচ যুবক হাঁটছে; তাদের একজন অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে। দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করে নিরাপদে চলে যাওয়ার দৃশ্য অবাক করে। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই আইনশৃংখলার পরিস্থিতি প্রায় অভিন্ন।
সিপিডি আয়োজিত এক সেমিনারে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেছেন, আইনশৃংখলা পরিস্থিতির বিষয়ে তারা এখনো নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। এখনো মব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আইনশৃংখলা নিয়ে আত্মতুষ্ট থাকলেও জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যমান শিল্প টিকে থাকতে পারছে না।
দেশের অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতিই যেকোনো সেক্টরে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা। নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ছাড়া দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন-২০২৫’ আয়োজন করেছিল। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে স্টার্টআপ বাংলাদেশ, আইসিটি বিভাগ ও বিডার যৌথ আয়োজনে বিশ্বের ৫০টি দেশের ৫৫০ জনের বেশি বিনিয়োগকারী অংশ নেয় এবং ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। গত ১৩ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিডা ‘রোডম্যাপ ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি’ শীর্ষক সম্মেলনের আয়োজন করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে মব সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছিল সেটা এখনো চলছে। দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে কোন্দল, হানাহানি, মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এসবের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরাও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছেন। গতকাল নারায়ণগঞ্জ থেকে বিএনপির এক এমপির ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।
গত ২০ জুন ইনকিলাবে প্রকাশিত খবরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলকারীদের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মহাসড়কের পাশে বসানো সিসি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মহাসড়কে চলাচল করা যাত্রীদের নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মাসদাইর এলাকায় রাত গভীর হলেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। মোহাম্মদপুর এখন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
এফবিসিসিআইয়ের এক সেমিনারে প্রশাসক আবদুর রহিম খান বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও বাজার ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু রাখার বিকল্প নেই।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, আইনশৃংখলার পাশাপাশি সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তিনটি বড় সংকট দেখা যাচ্ছে: কর্মসংস্থানের সংকট, বিনিয়োগের সংকট এবং শিক্ষার গুণগত মানের সংকট।
দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ২৫ শতাংশ আসএ খাতের উদ্যোগগুলো থেকে। গার্মেন্টস সেক্টরের পাশাপাশি এ সেক্টর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতি প্রাণবন্ত রাখার ক্ষেত্রে চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন সরকারের জন্য দুই বছর সময় চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সরকারকে দুই বছর সময় দিতে হবে। দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতার দিকে যাবে। তৃতীয় বছর থেকে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে।