সংসদে মিথ্যা বললে কী শাস্তি হয়?
জাতীয় সংসদে সদস্যদের বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য উপস্থাপন নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকজন এমপির বিতর্কিত বক্তব্যের পর স্পিকার সেগুলো কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী স্পিকার এই ধরনের বক্তব্য সংশোধন বা বাতিল করতে পারেন।
সংসদে প্রতিটি তথ্য সত্য বলেই ধরে নেওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে পরিসংখ্যানগত ভুল, অসম্পূর্ণ তথ্য বা বিভ্রান্তিকর দাবি করা হয়েছে। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই কয়েকজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত এপ্রিলে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করলেও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে বলেছিলেন, জলজট তৈরি হয়েছিল, জলবদ্ধতা নয়। এছাড়া, ২ এপ্রিল সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ আনলে মন্ত্রী মিথ্যা শব্দটিকে অসংসদীয় উল্লেখ করে তা বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
বগুড়ার মোকামতলা উপজেলায় সীমান্ত ও দিগন্ত নামে দুটি নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠন নিয়ে গত ১৫ জুন সংসদে আলোচনা হয়। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য জানান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বড় ছেলের নাম সীমান্ত ও ছোট ছেলের নাম দিগন্ত। জবাবে মীর শাহে আলম বলেন, তাঁর সন্তানের নাম মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত, কিন্তু নামের আগে মীর নেই। পরে প্রধানমন্ত্রী ২০ জুন ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন।
১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াত এমপি আব্দুল মুনতাকিম বলেন, তাঁর বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, তাঁর পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় তাঁর জন্ম তারিখ ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। অর্থাৎ, তাঁর বাবা ১৯৭১ সালে শহীদ হলে তিনি ১৯৮১ সালে জন্ম নিতে পারেন না। পরে এমপি ভুল স্বীকার করে স্পিকারের কাছে কারেকশন দেন এবং স্পিকার বক্তব্যটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, সংসদ সার্বভৌম এবং সংসদ সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তবে কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, কোনো সদস্য যদি অসত্য তথ্য দেন তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকেন এবং স্পিকারের অনুমতি নিয়ে কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ পান।
কার্যপ্রণালী বিধির ৩০৭ ধারায় বলা আছে, কোনো সদস্য যদি মানহানিকর, অশালীন বা অসংসদীয় শব্দ ব্যবহার করেন তবে স্পিকার সেই বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাতিল করার আদেশ দিতে পারেন। তবে সংসদের ভেতরে বক্তব্যের জন্য সংসদ সদস্যদের শাস্তির ব্যবস্থা থাকা সংসদীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করেন শাহদীন মালিক।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, অনেক জনপ্রতিনিধির মনে একটি ধারণা কাজ করে যে, সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সরল ও অসচেতন। এ কারণে তারা সহজে পার পেয়ে যাবেন বলে মনস্তত্ত্ব থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে পারেন। তবে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এই ধরনের মিথ্যাচারের চূড়ান্ত শাস্তি দেয় জনগণ পরবর্তী নির্বাচনে ভোট না দিয়ে।