সব সংবাদ
ফেনী

দাগনভূঞায় ১৬ বছরের অবহেলিত সড়কে হাজারো মানুষের চরম দুর্ভোগ

দাগনভূঞা উপজেলার কেরোনিয়া মিদ্দা বাড়ি থেকে বৈরাগীর বাজার পর্যন্ত প্রায় দেড় যুগ আগে নির্মিত এই সংযোগ সড়কটি ১৫-১৬ বছর ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী ও নারী-বৃদ্ধসহ হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন।

দাগনভূঞা উপজেলার কেরোনিয়া মিদ্দা বাড়ি তেমুহুনি থেকে কেরোনিয়া হোসাইনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়ে বৈরাগীর বাজার রোড পর্যন্ত বিস্তৃত এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কটি বর্তমানে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। প্রায় দেড় যুগ আগে সড়কটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের সংস্কার, মেরামত কিংবা উন্নয়নমূলক কাজ না হওয়ায় এটি বর্তমানে কার্যত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়কের সরকারি আইডি নং ৪৩০২৫৫১২৯।

স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে তারা এই রাস্তার দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। জনপ্রতিনিধিদের বারবার জানিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাটি চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

এলাকাবাসী জানান, কেরোনিয়া মিদ্দা বাড়িসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের জন্য এই সড়কটি শুধু যোগাযোগ পথ নয়, এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রধান অবলম্বন। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ী, নারী ও বৃদ্ধসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত, খানাখন্দ ও ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও পিচ উঠে গিয়ে নিচের ইট-খোয়া বের হয়ে এসেছে, আবার অনেক স্থানে রাস্তার অংশ বসে গিয়ে গভীর খাদে পরিণত হয়েছে।

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবুল কাশেম জানান, এই সড়কের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। অনেক পরিবহন চালক এই রাস্তা দিয়ে আসতে অনীহা প্রকাশ করেন। আরেক ব্যবসায়ী আশরাফ উদ্দিন ইফাদ বলেন, বৈরাগীর বাজারের সঙ্গে এই সড়কের যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাস্তার এমন করুণ অবস্থার কারণে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়েই ভোগান্তিতে পড়ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুকনো মৌসুমে ধুলাবালির কারণে চলাচল করা যেমন কষ্টকর, তেমনি বর্ষা মৌসুমে এই সড়ক যেন এক বিভীষিকায় রূপ নেয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কের অধিকাংশ অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। গর্তগুলো পানির নিচে ঢেকে যাওয়ায় কোথায় রাস্তা আর কোথায় খাদ তা বোঝার উপায় থাকে না। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারী ও যানবাহনের চালকরা। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহী, রিকশাচালক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের জন্য এই সড়কটি হয়ে উঠেছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন কেরোনিয়া হোসাইনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের এই ভাঙাচোরা, কাদামাখা ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক পাড়ি দিতে হয়। শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ঔহিদ আহাম্মেদ বলেন, প্রতিদিন স্কুলে যেতে এই ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। বর্ষাকালে কাদা আর পানির কারণে অনেক সময় পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।

বর্ষাকালে অনেক শিক্ষার্থী কাদা-পানিতে পড়ে গিয়ে আহত হয় কিংবা স্কুলে পৌঁছানোর আগেই পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যালয়ে যাওয়ার অনীহা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, এই সড়কের কারণে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েন অসুস্থ রোগী ও তাদের স্বজনরা। কোনো ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে এই সড়ক দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় রোগীকে খাটিয়া, ভ্যান কিংবা মানুষের কাঁধে করে মূল সড়ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে।

একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, বিগত বছরগুলোতে তারা বহুবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিভিন্ন সময় সড়কটি সংস্কারের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই সড়ক নির্মাণের সময় এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছিল। সবাই ভেবেছিল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে, এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে এবং মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এখন এটি এলাকাবাসীর জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপে পরিণত হয়েছে।

নারী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এই সড়ক আরও কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের চলাচলে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ ভাঙা সড়ক ও পর্যাপ্ত আলোর অভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা অবিলম্বে সড়কটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে দাগনভূঞা উপজেলা প্রকৌশলী মাসুৃম বিল্লা জানান, তারা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছেন। সামনের দিকে সরকারি বরাদ্দ আসলে এই সড়কের ব্যাপারে উপরের মহলে যোগাযোগ করে কাজ করানোর চেষ্টা করবেন।