সব সংবাদ
লাইফস্টাইল

মানুষের চার শ্রেণি: জ্ঞান ও সম্পদের ভিত্তিতে পরীক্ষা

ইসলামে জ্ঞান ও সম্পদ উভয়ই আল্লাহর পরীক্ষা। মহানবী (সা.) মানুষকে চার শ্রেণিতে ভাগ করেছেন— জ্ঞান ও সম্পদ উভয়ই যার আছে সে সর্বোত্তম, শুধু জ্ঞান আছে কিন্তু সম্পদ নেই এমন ব্যক্তি উত্তম নিয়তের কারণে সমান সওয়াব পায়, সম্পদ আছে কিন্তু জ্ঞান নেই সে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং কোনোটিই নেই কিন্তু খারাপ নিয়ত আছে সেও পাপের অংশীদার হয়।

ইসলামে জ্ঞান ও সম্পদ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা এবং আমানত। মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন তার ধন-সম্পদ দিয়ে নয়, বরং তার জ্ঞান, বিবেক, নিয়ত এবং সেই সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। মহানবী (সা.) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে মানুষের চারটি শ্রেণির কথা উল্লেখ করেছেন যা আমাদের আত্মপর্যালোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

প্রথম শ্রেণি হলো জ্ঞান ও সম্পদ উভয়ের অধিকারী— যারা সর্বোত্তম মানুষ। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান ও সম্পদকে তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যবহার করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে, দান-সদকা করে এবং সমাজকল্যাণে ব্যয় করে, সে সর্বোত্তম মানুষের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ ও জ্ঞান দান করেছেন, সে তার সম্পদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তাতে আল্লাহর হক আদায় করে— এ ব্যক্তি সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী। (তিরমিজি ২৩২৫)

দ্বিতীয় শ্রেণি হলো জ্ঞান আছে কিন্তু সম্পদ নেই— কিন্তু নিয়ত উত্তম। এ ব্যক্তি সম্পদশালী নয়, কিন্তু তার অন্তর সৎ। সে মনে করে, যদি তার সম্পদ থাকত তবে সেও আল্লাহর পথে ব্যয় করত। তার এই আন্তরিক নিয়তের কারণে আল্লাহ তাকে সম্পদশালী নেককার ব্যক্তির সমপরিমাণ সওয়াব দান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আরেক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছেন কিন্তু সম্পদ দেননি, সে বলে, ‘আমার কাছে যদি সম্পদ থাকত, তবে আমি অমুক ব্যক্তির মতোই সৎকাজে ব্যয় করতাম।’ সে তার নিয়তের কারণে সমান সওয়াব লাভ করবে। নিয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সকল আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত।’ (বুখারি ১, মুসলিম ১৯০৭)

তৃতীয় শ্রেণি হলো সম্পদ আছে কিন্তু জ্ঞান নেই— সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ। এ ব্যক্তি প্রচুর সম্পদের মালিক হলেও জ্ঞানের অভাবে তা অন্যায়, অপচয় ও পাপের পথে ব্যয় করে। সে আল্লাহর হক আদায় করে না এবং নিজের সম্পদকে ধ্বংসের উপকরণে পরিণত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দেননি, সে অজ্ঞতার কারণে সম্পদ অপব্যবহার করে, আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে না এবং আল্লাহর হকও আদায় করে না— এ ব্যক্তি সবচেয়ে নিকৃষ্ট মর্যাদার অধিকারী।

চতুর্থ শ্রেণি হলো না জ্ঞান আছে, না সম্পদ— তবুও মন্দ নিয়ত। এ ব্যক্তি দরিদ্র হলেও তার অন্তর কলুষিত। সে মনে করে, যদি তার সম্পদ থাকত, তবে সেও অন্যায়ের পথে ব্যয় করত। তাই সে পাপ কাজ না করেও তার খারাপ নিয়তের কারণে গুনাহের অংশীদার হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আরেক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ না সম্পদ দিয়েছেন, না জ্ঞান, সে বলে, ‘আমার কাছে যদি সম্পদ থাকত, তবে আমি অমুক ব্যক্তির মতোই অন্যায় কাজে ব্যয় করতাম।’ সে তার নিয়তের কারণে সমপরিমাণ গুনাহ লাভ করবে।

এই হাদিস থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো— জ্ঞান ও সম্পদ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, সম্পদের চেয়ে সঠিক জ্ঞান অধিক মূল্যবান, উত্তম নিয়ত মানুষকে উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয়, খারাপ নিয়ত মানুষকে পাপের অংশীদার বানায়, সম্পদের পরিমাণ নয় বরং তার সঠিক ব্যবহারই সফলতার মাপকাঠি এবং জ্ঞানহীন সম্পদ ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। মহানবী (সা.)-এর এই হাদিস আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন তার ধন-সম্পদ দিয়ে নয়, বরং জ্ঞান, নিয়ত ও আমলের মাধ্যমে হয়। আল্লাহর কাছে সফল সেই ব্যক্তি যে তার দেওয়া জ্ঞান ও সম্পদকে কল্যাণের পথে ব্যবহার করে। আর যার কাছে কিছুই নেই, কিন্তু অন্তর সৎ ও নিয়ত বিশুদ্ধ, সেও আল্লাহর দরবারে উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত জ্ঞান অর্জন করা, নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা এবং আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামত তার সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করা।