অভিযোগের জালে সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান
আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তাঁর চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে শেয়ারহোল্ডাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে ১৩ পৃষ্ঠার স্মারকলিপি দিয়েছিলেন।
১৯৯৫ সালে বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার এ জেড এম শামসুল আলমের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিক এই ব্যাংক ২০০৮ সাল পর্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হলেও, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপের সহযোগীরা ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই শেখ পরিবারের ঘনিষ্ট সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, এস আলম এবং কেডিএস গ্রুপ যৌথভাবে ব্যাংকের অনেক পুরাতন ও সৎ পরিচালকদের জোরপূর্বক অস্ত্রের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করে নিজস্ব লোক দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করে ব্যাংকটি দখল করেন। কেডিএস গ্রুপের কর্ণধার খলিলুর রহমানের ছোট ভাই আহমেদু হকের সম্বন্ধী বদিউর রহমানকে পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বদিউর রহমানই ছিলেন চেয়ারম্যান। এই সময়ে বদিউর রহমানের মাধ্যমে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ দুটি ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা লোপাট করে ব্যাংকটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ব্যাংকের অবনতির জন্য সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি চক্র দায়ী। এছাড়া আর্থিক নানা অনিয়মের অভিযোগে এর আগে বদিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলাও করে। অভিযোগ আছে, এই বদিউর রহমানের মধ্যস্থতায়ই ওই সময়ে ব্যাংকটির উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার আব্দুল হাদী ও মো. এজাহার মিয়ার সকল শেয়ার খলিলুর রহমান জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করেন যা ছিল ফৌজদারী অপরাধ। এসব শেয়ারের বর্তমান ধারক হচ্ছেন সেলিম রহমান ও আহমেদুল হক। তারা খলিলুর রহমানের যথাক্রমে পুত্র এবং সহোদর। এভাবে নানাবিধ অপকৌশল ও দুর্নীতির মাধ্যমে এস আলম গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপ ব্যাংকের মোট শেয়ারের ৩৭ দশমিক ২৫ শতাংশ কুক্ষিগত করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বদিউর রহমান সিঙ্গাপুরে এরিয়েল মেরিটাইম প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের মাধ্যমে এর মূলধন জোগাড় করেন। এ বিষয়ে দুদকের দুটি মামলার কথাও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। স্মারকলিপির সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো-নিজস্ব কোম্পানির মাধ্যমে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করে সেগুলো ব্যাংকের গ্রাহকদের কাছে বিক্রি এবং পরে সেই গ্রাহকদের একই ব্যাংক থেকেই বিনিয়োগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া। 'মাস্টার্স অ্যান্ড ব্রাদার্স' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জাহাজ বিক্রির পর চুক্তি ভঙ্গ হলেও ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বিনিয়োগের অর্থ পরিশোধ করানো হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এতে ব্যাংক প্রায় ৫৯ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। ডব্লিউবিআইইএমএস ইস্পাত ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জাহাজ বিক্রি করে ব্যাংকের বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়া হয়। বর্তমানে ওই গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের পাওনা ১০৯ কোটি টাকা, অথচ সহায়ক জামানতের মূল্য মাত্র ১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বদিউর রহমানের বড় জামাতা শাহাবুল ইসলামের মালিকানাধীন চারটি প্রতিষ্ঠানে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৬৬৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকার বিনিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ এর বিপরীতে সহায়ক জামানতের মূল্য ছিল মাত্র ৫০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ডা. বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ ইউসুফ, যিনি ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও বদিউর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর মালিকানাধীন আয়মন টেক্সটাইলস অ্যান্ড হোসিয়ারিকে ৪১২ কোটি টাকার বিনিয়োগ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। বদিউর রহমানের ভাগনে শরিফ চৌধুরীকে দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাঁর মাধ্যমে খিলক্ষেত শাখা থেকে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকার ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়াও চেয়ারম্যান হওয়ার পর আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও নিজ এলাকার বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিকে ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এআইবিএল ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস লিমিটেডকে ঘিরেও বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নেগেটিভ ইকুইটি ৭৬৮ কোটি টাকা ছিল বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। রেজাউর রহমান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কর্মরত থাকাকালে অনিয়মের অভিযোগে চাকরি হারান। পরে আল-আরাফাহ ব্যাংকে যোগ দিয়ে মাত্র তিন বছরের মধ্যে পাঁচটি পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের এমডি হন। অভিযোগকে উদ্দেশ্য ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে উল্লেখ করে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, তাঁর দায়িত্বকালীন দুদকে কোন মামলা হয়নি। তিনি ২০১৮ সালে দুদক মামলা করে কিন্তু এখনো চার্জশিট দিতে পারেনি। এমনকি দুদক ২০২০ সালে অর্থপাচারের অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণ পায়নি বলে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে।