ইউরোপে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ, ইতালি-বলকানে জরুরি অবস্থা
ইউরোপজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহে জীবনহানি অব্যাহত। ইতালিতে ২২টি শহরে লাল সতর্কতা জারি, বলকান অঞ্চলে দাবানলের শঙ্কা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২১ জুন থেকে মহাদেশে ১,৩০০ অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে।
ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইতালি ও বলকান অঞ্চলে এই প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং দাবানলের শঙ্কা বেড়েছে। ইতালিতে সোমবার ২২টি শহরে লাল তাপ সতর্কতা জারি করা হয়েছে — উত্তরের বোলজানো থেকে দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের পালার্মো পর্যন্ত। ভ্যাটিক্যানে, পিলগ্রিমরা ফ্যান ও ছাতা ব্যবহার করে তীব্র গরম থেকে নিজেদের রক্ষা করেন, যেখানে পোপ লিও ফিস্ট অফ সেইন্টস পিটার অ্যান্ড পল উদযাপন উপলক্ষে ব্যালকনি থেকে তাঁর অ্যাঞ্জেলাস বার্তা প্রদান করেন — যা রোমে একটি ছুটির দিন। ক্রোয়েশিয়ার আবহাওয়া সেবা রাজধানী জাগ্রেব, স্প্লিট ও দুব্রোভনিকসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে লাল সতর্কতা জারি করেছে। অ্যাড্রিয়াটিক দ্বীপে ভিসে, স্প্লিট থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে পাইন বনে আগুন জ্বলতে থাকে, যেখানে চারটি বিমানের সহায়তায় ডজনের বেশি দমকল কর্মী যুদ্ধ করছেন। বলকান অঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকায় তীব্র গরম অব্যাহত রয়েছে — ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির কিছু অংশে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি তাপমাত্রা পূর্বাভাস করা হয়েছে। আলবেনিয়ায়, দক্ষিণের ক্লোস গ্রামের কাছে ঝোপঝাড় ও জলপাই গাছে আগুন ছড়িয়ে পড়লে দমকল কর্মীরা তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছেন। ইতালিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি লুকা মারকালি রয়টার্সকে বলেছেন, 'তীব্র গরমের কারণে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে, তবে বৃষ্টিও হচ্ছে যা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করছে।' তবে তিনি উল্লেখ করেন, এই ঝড়গুলো স্থানীয় এবং বৃষ্টিপরিমাণ এলাকা অনুযায়ী ভিন্ন হবে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তাপ এখনো শেষ হয়নি। ইতালিয়ান এয়ার ফোর্সের আবহাওয়াবিদ দানিয়েলে মোশিও জানিয়েছেন, বর্তমান তাপমাত্রা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকবে। পশ্চিম ইউরোপে জুনের রেকর্ড তাপমাত্রার পর কিছুটা স্বস্তি মিললেও, মারকালি বলেছেন ৫ বা ৬ জুলাই থেকে আবার তাপপ্রবাহ আসবে যা ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও ব্রিটেনের কিছু অংশকে প্রভাবিত করবে। ২০ জুন শুরু হওয়া ইউরোপের তাপপ্রবাহ এরইমধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করেছে, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২১ জুন থেকে মহাদেশে ১,৩০০ অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে। ফ্রান্স ১,০০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর রিপোর্ট দিয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বেশিরভাগ শিকার বয়স্মানুষ এবং সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফরাসি গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্যারিস ও আশেপাশের এলাকার শবাগারগুলো মৃতদেহের সংখ্যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই তাপপ্রবাহ 'বাস্তবে অসম্ভব' হতো, যা গত দুই দশকে রাতের তীব্র তাপমাত্রাকে ১০০ গুণ বেশি সম্ভাব্য করেছে। রবিবার এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসাস বলেছেন, ইউরোপ পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়ন হওয়া মহাদেশ, যা বিশ্ব গড়ের দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। তিনি লিখেছেন, 'তাপের চাপকে প্রায়ই নীরব খুনি বলা হয়। ইউরোপের বাড়ি, কর্মক্ষেত্র ও স্কুলগুলো এই তাপমাত্রার জন্য নির্মাণ করা হয়নি।'