তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা, করমুক্ত আয়সীমা বেড়ে ৪ লাখ টাকা
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী ও সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার সব সময়ই কৃষি ও কৃষিবান্ধব নীতিতে বিশ্বাসী। এরই ধারাবাহিকতায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের মতো বৃহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটকে সুন্দর, স্বাভাবিক ও বাস্তবমুখী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বাজেটে ৬১টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে, যার ফলে বাজারে পণ্যের দাম স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে। উন্নয়ন ব্যয় পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি করে তিন লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
এদিকে, অর্থবিল-২০২৬ পাসের সময় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা পৌনে ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে করদাতারা তাদের আয়ের ওপর আগামী অর্থবছরে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন ও পৌর এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের বণ্টননামা দলিজ নিবন্ধন এবং সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রেও টিআইএন সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনে আনা বিশেষ বিধানও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। শর্ত হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাংগুয়েজ ল্যাব স্থাপন করতে হবে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। অনলাইন ভিডিও ভিত্তিক সেবা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। স্বর্ণ, রৌপ্য, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকারের ভ্যাট কাঠামো নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে শক্তিশালী বক্তব্য পেশ করেন। তিনি বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল দুটি টায়ারের মতো, যেকোনো একটি অকেজো হলে রাষ্ট্রযান চলতে পারবে না। তিনি দেশের স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর জনবল ও সরঞ্জাম বাড়ানোর ওপর জোর দেন। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় তিনি গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে চলমান সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বলেন, বাজেটের সফলতা কেবল ঘোষণার মধ্যে নয়, বরং এর কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত। তিনি স্বীকার করেন যে দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। প্রস্তাবিত ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এটি বিনিয়োগ ও উৎপাদনের চাকা সচল করার বাস্তব প্রতিফলন। ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বাতিল করার ঘোষণা দেন তিনি।