বরিশালে বেসরকারি ক্লিনিকে ভুল রক্তমিশ্রণে প্রসূতির মৃত্যু, অব্যবস্থাপনায় জীবনের ঝুঁকি বাড়ছে
বরিশালের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভুল রক্ত পরিশ্রুতিতে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও চিকিৎসা অবহেলায় একাধিক মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। জেলায় দুই শতাধিক ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার কার্যক্রম পরিচালনা করলেও অনুমোদিত রয়েছে মাত্র ১৩৮টি।
বরিশালের ভোলায় বন্ধন হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ান অপারেশনের সময় ভুল রক্ত পরিশ্রুতির কারণে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি স্ত্রী লামিয়াকে ক্লিনিকে ভর্তি করান মোহাম্মদ শরীফ। ৮ জানুয়ারি সন্তান জন্মের পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ রক্তের ক্রসম্যাচ না করেই রক্ত পুশ করে। পরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, ভুল রক্ত দেওয়ায় রক্তকণিকা ভেঙে গেছে। ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় লামিয়া মারা যান। এই ঘটনায় মামলা না করলেও শরীফের সংসার ভেঙে গেছে।
শুধু এই ঘটনা নয়, বরিশাল বিভাগে চিকিৎসা অবহেলায় একাধিক মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চিকিৎসকের অবহেলায় প্রসূতি তামান্না বেগমের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি বাবুগঞ্জের হালিমা-মান্নান মেমোরিয়াল ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় রাজীব খলিফা ক্ষতিগ্রস্ত হন। ২০২৩ সালের ১ আগস্ট বরিশাল নগরীর রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ছয় মাস বয়সী শিশু তানজিম ইসলামের মৃত্যু হয়। সম্প্রতি নগরীর কেএমসি হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় যুবদল নেতা মনির খানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসকদের সংঘর্ষ হয়।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বরিশাল নগরীতে অনুমোদিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১৩৮টি। এর মধ্যে 'এ' ক্যাটাগরির ১৪টি, 'বি' ক্যাটাগরির ২৫টি এবং 'সি' ক্যাটাগরির ৯৯টি। নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল ৪৩টি। তবে বাস্তবে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বরিশাল ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম শহিদুল্লাহ বলেন, অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিবন্ধন পায়নি। তবে তার নিজ প্রতিষ্ঠান ইসলামিয়া ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারও ছয় বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত হওয়ার তথ্য সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে উঠে আসে।
গত ২৮ এপ্রিল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় আটটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সময় মেয়াদোত্তীর্ণ কিট ব্যবহার, প্রয়োজনীয় সনদ না থাকা এবং পরীক্ষার আগেই রিপোর্ট প্রস্তুতের মতো অনিয়মের অভিযোগে আট প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
নগরীতে দালাল চক্রের দাপটও প্রবল। বাস টার্মিনাল, হাসপাতাল ও সদর রোড এলাকায় প্রায় দেড়শ দালাল কাজ করে। তারা রোগী সংগ্রহ করে বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে যায় এবং কমিশন পায়। এক থ্রি-হুইলার চালক জানান, রোগী সংগ্রহ করে প্রতিদিন এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নজরদারি রয়েছে। ভুল চিকিৎসার প্রতিটি অভিযোগ তদন্ত করা হয়। বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. লোকমান হাকিম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারবে না, তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না।