অযোধ্যার রাম মন্দিরে তহবিল তছরুপ: ভক্তদের বিশ্বাসে বড় ধাক্কা, দর্শনার্থী কমেছে অর্ধেক
অযোধ্যার বিতর্কিত রাম মন্দিরে পুণ্যার্থীদের ভক্তি ও বিশ্বাসের টাকায় ভয়াবহ হরিলুটের অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই মন্দিরে দর্শনার্থী সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে হিন্দু পুণ্যার্থীদের সমাগম ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
ভারতের অন্যতম ধনী মন্দির হিসেবে পরিচিত অযোধ্যার রাম মন্দিরে পুণ্যার্থীদের ভক্তি ও বিশ্বাসের টাকায় ভয়াবহ হরিলুটের অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই যেন মোহভঙ্গ হতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের। ২০২৪ সালে মহাধুমধামে উদ্বোধনের পর যে রামপথ ২৪ ঘণ্টা ভক্তদের পদচারণা আর উপচে পড়া ভিড়ে মুখরিত থাকত, সেখানে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অলঙ্কার তছরুপের এই চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারির সরাসরি প্রভাব পড়েছে মন্দিরের দৈনিক দর্শনার্থী সংখ্যার ওপর। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, গত মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অযোধ্যায় হিন্দু পুণ্যার্থীদের সমাগম নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়ে প্রায় অর্ধেকে (৫০ শতাংশ) নেমে এসেছে।
মন্দির সংলগ্ন এলাকার এক প্রসাদ বিক্রেতা নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'রাস্তার দুপাশে ব্যারিকেডের ভেতর যেখানে পা ফেলার জায়গা থাকত না, সেখানে এখন ভিড় অর্ধেক হয়ে গেছে। চন্ডীচুরির খবর ছড়ানোর পর থেকেই মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।'
প্রশাসনের হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, দানবাক্সের টাকা গণনার সময় সিসিটিভি বন্ধ রাখা এবং ট্রাস্টের ভেতরের লোকদের এই লুটপাটে জড়িত থাকার খবর সাধারণ ভক্তদের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
উত্তরপ্রদেশের সুলতানপুর থেকে আসা রাজেন্দ্র দুবে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, 'যারা ধরা পড়েছে তারা কেবল চুনোপুঁটি। আসল রাঘববোয়ালরা এখনও অধরা। রামের নাম ভাঙিয়ে যারা কোটি কোটি টাকা হরিলুট করল, তাদের আড়াল করা হচ্ছে।'
এদিকে, আহমেদাবাদ ও পুনে থেকে আসা দর্শনার্থীরাও এই কেলেঙ্কারিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভক্তদের একাংশের মতে, যেখানে দেশের কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করছে, সেখানে রামের নামে আসা অনুদান এভাবে লুট হওয়া চরম পাপ। অযোধ্যার স্থানীয় বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী সোনা দেবী আক্ষেপের সুরে বলেন, 'ভগবানের ঘর থেকে চুরি করে কেউ কোনোদিন পার পাবে না।'
তহবিল তছরুপের এই মহাসংকট ধামাচাপা দিতে 'শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টে'র সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায় এবং ট্রাস্টি অনিল মিশ্র ইতিমধ্যেই তাদের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশ সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) এ পর্যন্ত ৮ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে কিছু টাকা উদ্ধার করলেও মূল ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় না আনায় ক্ষোভ বাড়ছে। প্রবীণ সাংবাদিক পি. রমন এই তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন।
এদিকে রাম মন্দিরের ভেতরের এই চরম অরাজকতা ও ভক্তদের ক্ষোভের খবর যাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না পায়, সেজন্য তড়িঘড়ি করে সাংবাদিকদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে অযোধ্যা পুলিশ। প্রশাসনের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে ভিডিও বা লাইভ রিপোর্ট করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যা তথ্য গোপনের এক মরিয়া চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের উদ্বোধনের পর যে রাম মন্দিরকে ঘিরে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার দেশজুড়ে এক বিপুল উন্মাদনা তৈরি করেছিল, ২০২৬ সালের এই 'তহবিল কেলেঙ্কারি' ও 'হরিলুট'-এর ঘটনা সেই ভাবমূর্তিতে এক বড়সড় ধাক্কা দিল। যার স্পষ্ট প্রমাণ প্রতিদিন কমতে থাকা সাধারণ মানুষের এই ভিড়।