মুস্তাফা মনোয়ার: বাংলাদেশের পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ ও ‘মনের কথা’র স্রষ্টার জীবনাবসান
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও পাপেট শিল্পের অগ্রণী মুস্তাফা মনোয়ার (২৯ জুন) প্রয়াণ পেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’-এর স্রষ্টা, যেখানে পারুল ও বাউলের মাধ্যমে শিশুদের মনে আনন্দের জাদু ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার এই অনুষ্ঠান নব্বই দশকের শেষের দিকে একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের শৈশবকে রঙিন করে তুলেছিল।
মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক পাপেট শিল্পের অগ্রদূত। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, টেলিভিশনের মাধ্যমে পাপেট শিল্পকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রণী। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হলো বিটিভিতে প্রচারিত ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠান, যা নব্বই দশকের শেষ দিকে শিশুদের মনে অবিস্মরণীয় স্থান করে নিয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে পারুল ও বাউল নামের দুই পাপেট চরিত্রের মাধ্যমে গল্প বলা হতো। বাউল একতারা নিয়ে গান গাইত, আর পারুল এসে মজার মজার গল্প জুড়ত — এই যুগলবন্দি একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের শৈশবকে আনন্দময় করে তুলেছিল।
তার পাপেট শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক আগে। কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করার পর তিনি ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং সেখানেই পাপেট নিয়ে কাজ করার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচ তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও প্রদর্শনের অগ্রণী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি নিজের পাপেট দল এবং বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেছিলেন, যেখানে তার কাজ ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিল। তার পাপেটের প্রধান চরিত্র ‘পারুল’-এর নাম এসেছে আবহমান বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা’ লোককথা থেকে।
১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফীর একটি ডকুমেন্টারিতে প্রথম তার পাপেট কাজ দেখা যায়। পরবর্তীতে টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্র রচনা করে পাপেট প্রদর্শনী করেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে এই পাপেট নাটকের মাধ্যমে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ ও বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী পাকিস্তানি মনোভাবকে ব্যঙ্গ করা হতো।
তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা এবং জমিলা খাতুন দম্পতির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। পারিবারিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা মুস্তাফা মনোয়ার ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাজীবন শুরু করলেও দেশের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পাপেট নিয়ে কাজ করেছেন এবং অসংখ্য অনুসারী ও গুণগ্রাহী তৈরি করেছেন। তার প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং সামাজিক মাধ্যমে নেটিজেনরা তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।