সব সংবাদ
অর্থনীতি

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতা

২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে সংশোধিত এডিপির মাত্র ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

সরকার প্রতিবছর যে বাজেট প্রণয়ন করে, তার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে একটি বরাদ্দ থাকে। এই বরাদ্দকৃত অর্থে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। দেশের কোন খাতে উন্নয়ন কতটা হলো, বছর শেষে তার একটি হিসাব পাওয়া যায়। দেশ উন্নয়নে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গুরুত্ব কতটা, এ থেকেই তা উপলব্ধি করা যায়। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, কোনো বছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না। একটা অংশ অবাস্তবায়িত থেকেই যায়। এর অর্থ, বার্ষিক উন্নয়ন লক্ষ্য যত অংশই হোক, অনর্জিত থেকে যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আংশিক বাস্তবায়ন না করতে পারাও সরকারের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে সরকার কখনোই বেরিয়ে আসতে পারছে না বা পারে না, প্রসঙ্গক্রমে এখানে এ কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য যে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়, পরে তা কমিয়ে সংশোধন করা হয়। একে বলা হয় সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা সংশোধিত এডিপি। এই সংশোধিত এডিপিও শেষ পর্যন্ত সর্বাংশে বাস্তবায়িত হয় না। প্রতি বছরের মতো ২০২৫-২৬ বছরেও সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়ন শোচনীয় অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে সংশোধিত এডিপির অর্ধেকও বাস্তবায়ন হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, বাস্তবায়নের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। সংশোধিত এডিপি ব্যয়ের এ হার ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। ১১ মাসে এডিপির বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৭৬৯ কোটি টাকা। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল এক লাখ ১১ হাজার ছয় কোটি টাকার মতো। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়নের অগ্রগতি কম হওয়ার মূল এডিপি ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে দুই লাখ কোটি টাকা করা হয়। সংশোধিত এডিপির অর্ধেকও বাস্তবায়ন না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক বললেও কম বলা হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১১ মাসে সংশোধিত এডিপির ব্যয় অর্ধেকের কম হওয়ার সঙ্গত কারণ ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এডিপি বাস্তবায়নে স্থবিরতা দেখা যায়। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রকল্প খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিলে থমকে যায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। অনেক প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়। কোনো কোনো প্রকল্প বন্ধ করে দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়া পড়ে এডিপি বাস্তবায়নের হারে। প্রশ্ন উঠতে পারে, অন্তর্বর্তী সরকার অন্যান্য কাজে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নে গুরুত্ব কম দিলেও নির্বাচিত সরকারের সময়ে এডিপি বাস্তবায়নে গতি আসেনি বা আসছে না কেন? সরকারের চার মাসে এডিপি বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি আছে বলে মনে হয় না। থাকলে বাস্তবায়ন হার এতনিম্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিত না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নে বিভিন্ন সংকট ও প্রতিবন্ধকতা নতুন নয়। যথাসময়ে অর্থ ছাড় না হওয়ায় প্রকল্পের কাজে বিলম্ব হতে দেখা যায়। বছরের শুরুতে কাজ শুরু না হলে প্রকল্পের পুরো অথবা আংশিক বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে বাধ্য এবং সেটিই হয়। অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্তরা ইচ্ছা করে কাজে ধীরতা অবলম্বন করে। বছরের শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে কাজ করে অর্থ লোপাট করাই তাদের লক্ষ্য থাকে। এটি বরাবরই দেখা যায়, বছরের শেষ দু-তিন মাসে বাস্তবায়নের হারে বড় রকমের উল্লম্ফন ঘটে। প্রকল্প বাস্তবায়নের এই ধারা বছরের পর বছর ধরে চলছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির নির্ধারিত উন্নয়ন লক্ষ্য যেমন অর্জিত হয় না তেমনি ব্যয় বা খরচ শেষ পর্যন্ত যা দেখানো হয় তার একটা বড় অংশই লুটপাট হয়ে যায়। তাছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দিলেই সবকিছু হয়ে যায় না। এজন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন প্রকল্পের নিখুঁততা, বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, বাস্তবায়নে ত্রুটি ও ব্যয়বৃদ্ধির জন্য সক্ষমতা ও অদক্ষতার দায় সবচেয়ে বড়। বলা বাহুল্য, বাজেটের আকার প্রতিবছর বাড়ানোয় কোনো কৃতিত্ব নেই, যদি না তা বাস্তবায়নযোগ্য হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে লাখ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে যদি তার অর্ধেকও ব্যয় করা যায়, তবে ওই বরাদ্দ দেয়ার কি কোনো মানে হতে পারে? সবাই আশা করে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে উন্নয়নের একটা কর্মপ্রবাহ তৈরি হবে। মানুষের কর্মসৃজন হবে, অর্থের একটা বড় অংশ গ্রামপর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে। এতে উন্নয়ন ও আর্থিক লাভ- দুই হবে। এখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ব্যক্তিক অর্থনীতিও শোচনীয়। বিনিয়োগ নেই। কি দেশি, কি বিদেশিÑ দু’ক্ষেত্রেই খরা চলছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৪ সালের পর এ পর্যন্ত ৭টি শিল্প এলাকার ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মী বেকার হয়ে পড়েছে। মানুষের আয়-উপার্জন না বেড়ে বরং কমেছে। মূল্যস্ফীতি দুই সংখ্যার কাছাকাছি। এ অবস্থার উত্তরণে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও কর্মপ্রবাহের একটা জোয়ারের প্রয়োজন।

এজন্য সরকারের উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও দক্ষতার বিকল্প নেই। নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটের আকার অতীতের যেকোনো বছরের বাজেটের চেয়ে বড়। মোট আকার নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খাতের মতো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, যার পরিমাণ তিন লাখ আট হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন উঠতে পারে, গত অর্থবছরের দু’লাখ কোটি টাকার সংশোধিত এডিপির অর্ধেক বরাদ্দ যেখানে ব্যয় করা হয়নি, সেখানে এ বছর দেড়গুণের বেশি বরাদ্দ কি ব্যয় করা সম্ভব হবে? পর্যবেক্ষকদের মতে, আমাদের বাজেট যত বড়ই মনে হোক, বাস্তবায়নযোগ্য, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও সম্ভবপর। এজন্য সরকারকে সতর্ক, সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। শুরু থেকে ভালোভাবে শুরু করতে হবে। দক্ষতা, সক্ষমতা ও প্রশাসনিক যোগ্যতা বাড়াতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বাজেটগল্পের কোনো বিষয় নয়, যাচ্ছেতাই পরিসংখ্যানের বিষয়ও নয়। অতীতে গল্প ও মিথ্যা পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। ফলাফল কী হয়েছে, কারো অজানা নেই। নতুন সরকার বিগত চার-পাঁচ মাসে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নে কতদুর কী করেছে তার হিসাব-নিকাশ হওয়া দরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের জাতীয় সংসদে এ ব্যাপারে জবাবদিহি চাওয়া যেতে পারে। ঘোষিত নতুন বাজেট বাস্তবায়নে, বিশেষত এডিপি বাস্তবায়নে জবাবদিহির প্রয়োজন সর্বাধিক। কারণ, এই বাজেট ও এডিপি বাস্তবায়নের ওপর দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন-অগ্রগতি বিশেষভাবে নির্ভর করছে।

মূল প্রতিবেদন (Reference): এডিপি বাস্তবায়ন হতাশাজনক — Daily Inqilab