সব সংবাদ
ফেনী

মাদকাসক্তি: বাংলাদেশের এক নীরব মহামারী

বাংলাদেশে প্রায় ৭৫ লক্ষাধিক মাদকাসক্ত রয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস (২৬ জুন) উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন—সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

প্রতি বছরের ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস পালিত হয়। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং পরের বছর থেকে বিশ্বব্যাপী এটি পালন শুরু হয়।

মাদক বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এটি একটি নীরব ঘাতক যা মানুষকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে। বর্তমানে দেশের সর্বত্র মাদকের আগ্রাসন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে এবং যুবসমাজের একটি বিরাট অংশ এর করালগ্রাসে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে।

মাদকদ্রব্য এমন একটি পদার্থ যা মস্তিস্কের সংবেদনশীলতা হ্রাস করে এবং শরীরে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এর ব্যবহারে তন্দ্রাচ্ছন্নতা, মানসিক আচ্ছন্নতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, বমি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। মাদকাসক্তি এমন একটি অবস্থা যেখানে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময় পর পর মাদক গ্রহণ না করলে অশান্তি অনুভব করে। গবেষণায় দেখা যায়, ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে এবং গ্রহণের গড় বয়স ২২ বছর।

মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু সাধারণ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়—নতুন বন্ধুদের সাথে ঘনঘন চলাফেরা, বিভিন্ন অজুহাতে টাকা চাওয়া, দেরিতে বাড়ি ফেরা, রাতে জেগে থাকা ও দিনে ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেওয়া, ওজন কমে যাওয়া, মিথ্যা কথা বলার প্রবণতা এবং পারিবারিক মনোমালিন্য।

বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৭৫ লক্ষাধিক। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় ৪০ লাখ তরুণ! মাদকে আসক্ত হওয়ার প্রধান কারণ হলো মাদকের সহজ প্রাপ্তি, যার পেছনে সংঘবদ্ধ মাফিয়া চক্র সক্রিয় রয়েছে।

মাদকাসক্তির পেছনে রয়েছে নানাবিধ আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ—শহরায়নের জটিলতা, সহিংস ছাত্ররাজনীতি, বন্ধু-বান্ধবদের কুসংসর্গ, পারিবারিক অশান্তি এবং মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান।

মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস করে, নৈতিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে এবং ব্যক্তিকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। বিশ্বব্যাংকের জরিপে দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের প্রায় ৪৫ শতাংশই কোনো না কোনো সামাজিক অপরাধের সাথে যুক্ত।

২০১৩ সালের আগস্টে রাজধানীর চামেলীবাগে পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমানের মেয়ে ঐশী নেশার টাকার জন্য তার বাবা-মাকে হত্যা করে—এটি মাদকের ভয়াবহতার একটি জলন্ত উদাহরণ।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ, সামাজিক আন্দোলন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার উৎকর্ষ সাধন এবং যুবসমাজকে গঠনমূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

মূল প্রতিবেদন (Reference): মাদকের ভয়াবহতা রুখতে সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি — দ্য ডেইলি স্টার লাইন