কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি: সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবসহ ৩ পুলিশের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর রামপুরায় পুলিশের গুলিতে এক তরুণসহ তিনজন নিহত হওয়ার মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে ঢাকায় পুলিশের ব্যাপক গুলিবর্ষণের সময় রামপুরায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে মো. নাদিম (৩৮) নামে এক ব্যক্তি পেটে দুটি গুলি লাগে এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান। একই সময়ে আরেকটি ঘটনায় কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশের গুলি ও ধাওয়ার মুখে পড়ে আমির হোসেন (১৮) নামে এক তরুণ নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে আশ্রয় নেন। পুলিশ তাকে নিচে লাফ দিতে বললে তিনি রাজি না হওয়ায় পর পর ছয়টি গুলি করা হয়, যার ফলে তিনি গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া বনশ্রী জি ব্লকে রামপুরা থানার সামনে একটি বাড়িতে মায়া ইসলাম (৬০) নামে এক বৃদ্ধা ও তার ছয় বছরের নাতি বাসিত খান মুসা আশ্রয় নিচ্ছিলেন। পুলিশের গুলিতে শিশু মুসার মাথা ভেদ করে বুলেট বেরিয়ে তার দাদি মায়া ইসলামের পেটে বিদ্ধ হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়া ইসলাম মারা যান। এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।
রোববার (২৮ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায়ে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই পাঁচ আসামির মধ্যে শুধু চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং রায় ঘোষণার সময় তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল।
মামলার সাক্ষ্য প্রমাণে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে বনশ্রী এইচ ব্লকে জামে মসজিদের সামনে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এ সময় নাদিম নামে এক ব্যক্তি পেটে দুটি গুলি লাগে ও ঘটনাস্থলেই মারা যান। একই দিন বিকালে আমির হোসেন কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন এবং ছাদের রড ধরে ঝুলে পড়েন। পুলিশ তাকে নিচে লাফ দিতে বললে তিনি অmন্ত করলে পর পর ছয়টি গুলি করা হয়।
এই মামলায় গত বছরের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে ৭ অগাস্ট প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা দেন। ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারকাজ শুরু হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ আব্দুর রউফ ৩০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিলেও প্রসিকিউশন ১৪ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দি উপস্থাপন করে। এই সাক্ষীদের মধ্যে কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ যুবক আমির হোসেন, নিহত মায়া ইসলামের ছেলে ও গুলিবিদ্ধ শিশু মুসার বাবা মো. মোস্তাফিজুর রহমান, নিহত নাদিমের স্ত্রী তাবাসুম আক্তার নিহাসহ রামপুরা থানার পুলিশ কর্মকর্তারা রয়েছেন।
২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ যুবক আমির হোসেন। তিনি জবানবন্দিতে বলেন, জুমার নামাজের পর আফতাবনগর থেকে তিনি রামপুরায় ফুফুর বাসায় ফিরছিলেন। সেসময় পুলিশ ও বিজিবির গুলিবর্ষণের মুখে পড়েন এবং জীবন বাঁচাতে নির্মাণাধীন ভবনের চতুর্থ তলায় ওঠেন। তিনজন পুলিশ তাকে ধাওয়া করলে তিনি ছাদের রড ধরে ঝুলে পড়েন। পুলিশের কথায় সেখান থেকে নিচে ঝাঁপ দিতে না চাইলে একজন পুলিশ সদস্য তাকে পরপর তিনটি গুলি করেন। আরেকজন পুলিশ সদস্য এসে আরো তিনটি গুলি করেন, যার সবগুলোই তার পায়ে বিদ্ধ হয়। রাজধানীর ফেমাস হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল, ফরাজী হাসপাতাল, টঙ্গি আহছানিয়া হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল হয়ে সাভারের সিআরপি পর্যন্ত তার চিকিৎসা হয়।
এসআই মো. গোলাম কিবরিয়া খান ৪ নভেম্বর জবানবন্দি দেন। তিনি আদালতে বলেন, ভাইরাল ভিডিওতে নির্মাণাধীন ভবনের রড ধরে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করা এসআই তারিকুল ও এএসআই চঞ্চলকে রামপুরা থানায় এক সভায় শনাক্ত করা হয়েছিল। তিনি আরো বলেন, ঘটনার আগের দিন ১৮ জুলাই তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান আন্দোলন দমনে হাঁটু গেড়ে বসে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এই মামলায় ১৪ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দি উপস্থাপন করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা সিসিটিভি ভিডিও, কল রেকর্ড ও ওয়্যারলেস বার্তার অডিও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। আসামিপক্ষের এআই জেনারেটেড ভিডিওর দাবি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নাকচ করা হয়।
এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার ১৩ জানুয়ারি প্রথম দফায় তার সাফাই সাক্ষ্য দেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেছিলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তার নামে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ইস্যু করা ছিল না এবং ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
গত ৪ মার্চ রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন প্রসিকিউশন নতুন করে ডিজিটাল প্রমাণ দাখিলে চার সপ্তাহের সময় প্রার্থনা করে। পরবর্তীতে ৯ এপ্রিল শুনানির দিনে চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এএসআই চঞ্চলের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি নয়, বরং তা সম্পূর্ণ অথেনটিক। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসামিপক্ষ চঞ্চলের পুনরায় জবানবন্দি বা সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন।
গত ১০ জুন চঞ্চল সরকার ট্রাইব্যুনালে তার দ্বিতীয় দফার সাফাই সাক্ষ্য বা জবানবন্দি দেন। সেই জবানবন্দিতে তিনি সম্পূর্ণ নতুন অভিযোগ তুলে দাবি করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা তাকে তার কথামত স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছিলেন। তবে প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
১৫ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ নতুন সাক্ষ্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। সব সাক্ষ্য, প্রমাণ ও আইনি বিশ্লেষণ শেষে ট্রাইব্যুনাল-১ ২৮ জুন রায় ঘোষণার জন্য দিন ঠিক করে।