সব সংবাদ
খেলা

গিজনের কলঙ্কের প্রতিশোধে মুখোমুখি আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া, ৪৪ বছরের সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

২০২৬ বিশ্বকাপে জি গ্রুপের শেষ ম্যাচে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া মুখোমুখি হচ্ছে। ১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দুই দলের মধ্যে সেই বিতর্কিত ম্যাচটি হয়েছিল, যা 'গিজনের কলঙ্ক' নামে পরিচিত। এবার দুই দলই জয় এড়িয়ে চলে যেতে চাইছে, কারণ জিতলে স্পেনের মুখোমুখি হতে হবে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে জি গ্রুপের দুই রাউন্ডের খেলা শেষে পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে গেছে। আর্জেন্টিনা ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত করেছে এবং শেষ ম্যাচে বাদ পড়া জর্ডানের বিপক্ষে তারা পূর্ণ পয়েন্ট রেকর্ড বজায় রাখতে চাইবে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, তিন পয়েন্ট করে নিয়ে অস্ট্রিয়া নাকি আলজেরিয়া দ্বিতীয় স্থানে থাকবে। টুর্নামেন্টের ব্র্যাকেট অনুযায়ী, এই গ্রুপের রানার্সআপ শেষ ৩২-এ স্পেনের মুখোমুখি হবে।

অদ্ভুত বিষয় হলো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে একটি দল জেতার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়। কিন্তু অস্ট্রিয়ার ক্ষেত্রে এমন চিন্তা নতুন নয়।

১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে গিজনের এল মলিননে শেষ গ্রুপ ম্যাচে অস্ট্রিয়া ইচ্ছা করেই ১-০ গোলে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে যায়। এই ফলাফল দুই দলকেই তুলেছিল নকআউটে, আর বাদ পড়েছিল আলজেরিয়া। এই ঘটনা 'গিজনের কলঙ্ক' নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে।

ওইবার আলজেরিয়ার শুরু হয়েছিল দারুণভাবে। অভিষেকে তারা ১৯৭৪ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল, যেটা ছিল বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা অঘটন। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে ২-০ গোলে অস্ট্রিয়ার কাছে হারলেও তারা পরের পর্বে ওঠার পথে ভালো অবস্থানে ছিল।

চিলির বিপক্ষে ১-০ এবং পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৪-১ গোলে হারার পর আলজেরিয়া তৃতীয় রাউন্ডে খেলতে নেমেছিল ২ পয়েন্ট নিয়ে (তখন জয়ে ২ পয়েন্ট, ড্রয়ে ১)। চার পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে ছিল অস্ট্রিয়া, জার্মানিরও ছিল ২ পয়েন্ট এবং গোলপার্থক্যে দ্বিতীয় স্থানে।

২৪ জুন আলজেরিয়ার শেষ গ্রুপ ম্যাচ ছিল চিলির সঙ্গে, পরের দিন পশ্চিম জার্মানি-অস্ট্রিয়া। প্রথমার্ধে তিন গোলের লিড ছিল আলজেরিয়ার, কিন্তু দুই গোল হজম করে ৩-২ গোলে জিতে অস্ট্রিয়ার সমান চার পয়েন্ট পায়।

এই দুই গোল হজম গ্রুপে বড় প্রভাব ফেলেছিল। ফলে সমীকরণ দাঁড়ায়, পশ্চিম জার্মানি এক বা দুই গোলে অস্ট্রিয়াকে হারালেই আলজেরিয়াকে বিদায় করে দুই দলই নকআউটে পৌঁছে যাবে।

ম্যাচের ১১ মিনিটে জার্মানির হর্স্ট রুবেশ গোল করে ১-০ এগিয়ে নেওয়ার পর দুই দলের খেলোয়াড়রা আক্রমণ করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। তারা কেবল বল পাস করে সময় নষ্ট করতে থাকেন। স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং আলজেরিয়ান সমর্থকরা ফুটবলারদের দিকে টাকা ছুড়ে মারেন। ধারাভাষ্যকারও ধারাভাষ্য দেওয়া বন্ধ করে দেন। স্প্যানিশ পত্রিকা এল কমার্সিও ম্যাচের বিবরণী 'অপরাধ' বিভাগে প্রকাশ করেছিল।

এই ঘটনার পর ফিফা নিয়ম পরিবর্তন করে। তখন থেকে গ্রুপ পর্বের শেষ দুটি ম্যাচ একই দিনে ও একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যেন কোনো দল সমীকরণ জেনে ম্যাচ ফিক্সিং করার সুযোগ না পায়।

এখন সেই অস্ট্রিয়াকে আলজেরিয়া পাচ্ছে গ্রুপের শেষ ম্যাচে। 'গিজনের কলঙ্কের' ৪৪ বছর পর প্রথমবার মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির জন্যই যেন সাজানো হয়েছে এই ম্যাচ।

দুই দলই জিততে চাইছে না। জয় বাদে অন্য যেকোনো ফলাফল নকআউট রাউন্ড ড্রতে দুই দলকেই সুবিধা দেবে। কারণ জয়ী দল দ্বিতীয় স্থানে থেকে 'এইচ' গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে পাবে। আর তৃতীয় স্থানে থাকলে 'বি' গ্রুপ জয়ী সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে।

গোলপার্থক্যে এগিয়ে অস্ট্রিয়া, দ্বিতীয় স্থানে থাকতে কেবল ড্র প্রয়োজন। আর ড্র করলে আলজেরিয়া তৃতীয় স্থানেই থাকবে। এই কারণে দুই দলের কেউই জিততে চাইছে না। অস্ট্রিয়াকে স্পেনের মুখে ফেলে 'গিজনের কলঙ্কের' প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ আছে আলজেরিয়ার সামনে।

অস্ট্রিয়া কোচ রালফ রাগনিক বলেছেন, 'না, একদমই না। একবার খেলা শুরু হলে আমরা জানতে পারব, কিন্তু এটি আমাদের ম্যাচকে প্রভাবিত করবে না। আমরা কোনো ম্যাচে শুধু ড্রয়ের জন্যই খেলতে নামতে পারি না।'

আলজেরিয়া কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ বলেন, 'ফুটবলে যদি-বা কিন্তু বলে কিছু নেই। আমাদের প্রতিপক্ষের সামনে একইভাবে দাঁড়াতে হবে এবং জয়ের চেষ্টা করতে হবে।'

অস্ট্রিয়ান মিডফিল্ডার কোনরাড লাইমার বলেছেন, 'আমরা মাঠে নামব, জিততেই চাইব। কার মুখোমুখি হচ্ছি, সেটা কোনো ব্যাপার না।'