সব সংবাদ
আন্তর্জাতিক

তিস্তা প্রকল্পে চীনের স্পষ্ট বক্তব্য: ভারতকে আশ্বস্ত করতে ঢাকার সহযোগিতা 'তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে না'

চীন জোর দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। একই সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপও চায় না তারা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশ এই প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছে।

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের মধ্যেই চীন স্পষ্ট করে বলেছে, এই সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। শুক্রবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই এর প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এ কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটা তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ মুক্ত থাকা উচিত। পিটিআই এর সাংবাদিক তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি তুলে ধরে প্রশ্ন করেন যে, ভারতের গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে কারণ নদীটি সীমান্তের খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। এই উদ্বেগকে চীন কীভাবে দেখে? জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে প্রস্তুত আছে চীন। অর্থনীতি ও বাণিজ্য, পানি সংরক্ষণ ও জীবিকার মতো ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়াতে চায় তারা। তিনি আরও বলেন, জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে চীন। এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশ তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তা চান। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি কুওইং ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পাঁচদিনের চীন সফরের শেষদিন শুক্রবার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমপি) নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য ও সহযোগিতা দেবে চীন। এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কাজকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে দুদেশের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা দেবে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানি সম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়। পরবর্তীতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি। ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি আটকে থাকার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট (টিআরসিএমপি) হাতে নেয়। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইজিং সফরে এটিসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পে চীন সরকারের সহায়তা চেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়। ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চীনের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম ধাপের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা (৭৫০ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ৫৫০ মিলিয়ন ডলার চীনের কাছে ঋণ হিসেবে চাওয়া হয়েছে এবং বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মেটানো হবে।