বায়বীয় পরিকল্পনায় রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র: ৯ বছরেও উৎপাদনে যায়নি
প্রায় ৬ হাজার ৭৬২ কোটি টাকার রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প চালুর আগেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। কারিগরি ত্রুটি, গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও কমিশনিং জটিলতায় প্রকল্পটি প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি।
চার বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প এখনও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি। বরং নতুন নতুন সমস্যায় চালুর সময় আরও পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, বায়বীয় ধারণায় প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অথচ গ্যাস কোথা থেকে আসবে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। টারবাইনের নতুন যন্ত্রাংশেও ত্রুটি ধরা পড়ে। ফলে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎমন্ত্রীকে ডেকে এসব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
প্রকল্পের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, প্রথম ইউনিটের কমিশনিং পর্যায়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় গ্যাস টারবাইনের রোটর ঘিরে। প্রথমে ফার্স্ট ফায়ার সম্পন্ন করার পর থেকেই টারবাইনে অস্বাভাবিক কম্পন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে রোটর অতিরিক্ত গরম হয়ে পড়ায় সেটি স্থিতিশীলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। সমস্যা সমাধানে প্রথমে বিয়ারিং রিয়্যালাইনমেন্ট করা হয়। এরপর তিন দফায় মাস ব্যালান্সিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় টারবাইনের বিয়ারিং পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিদেশ থেকে নতুন বিয়ারিং আমদানি করে প্রতিস্থাপন করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং বিয়ারিং খুলে পরীক্ষা করার সময় রোটরের গায়ে স্ক্র্যাচ ধরা পড়ে।
এরপর রোটর খুলে মেরামতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এজন্য গ্যাস টারবাইনের এয়ার ইনটেক চেম্বার ও আপার কেসিং খুলে রোটর সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করতে হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই ধরনের মেরামতের জন্য বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ দল আনতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস অতিরিক্ত সময় লাগবে। মেরামতের ফলে রোটরের ব্যাস কিছুটা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় অর্ডার দিয়ে কাস্টমাইজড বিয়ারিং আনতে হবে।
এই ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিটের কমিশনিং নির্ধারিত সময়সূচি থেকে একাধিকবার পিছিয়ে যায়। সর্বশেষ প্রাপ্ত সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় মেরামত শেষে প্রথম ইউনিট চালু করতে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। তবে বাস্তব অগ্রগতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময়সীমাও আরও পিছিয়ে যেতে পারে। প্রকল্প পরিচালক আসাদ হালিম যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টারবাইনের সমস্যা সমাধানে কাজ করছে।
প্রথম ইউনিটের সমস্যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দ্বিতীয় ইউনিটে। প্রথম ইউনিট সচল করার প্রয়োজনে দ্বিতীয় ইউনিটের কিছু যন্ত্রাংশ খুলে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে দ্বিতীয় ইউনিট চালুর জন্য নতুন করে যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হচ্ছে। সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের আগে চালু হওয়া কঠিন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাস্তবে তা ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা। পেট্রোবাংলা ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দিলেও তা কমিশনিং সময়সূচির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। গ্যাসের অভাবে বাধ্য হয়ে এইচএসডি ব্যবহার করে কমিশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে, যা ব্যয় ও সময়-উভয়ই বাড়িয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুনে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। পরে একাধিক দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা প্রথমে ২০২৩, পরে ২০২৫ এবং সর্বশেষ ২০২৭ সাল পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্প ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম। তবে ব্যয় কমলেও বাস্তবায়ন অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।