যমুনার গর্ভে হারিয়ে গেল শতবর্ষী স্কুল, বাঁধের ওপর চলছে পাঠদান
বগুড়ার চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ষষ্ঠবারের মতো যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ১০৭ বছরের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এখন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর অস্থায়ী টিনের ছাউনির নিচে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় অবস্থিত চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ষষ্ঠবারের মতো যমুনা নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে। গত ১৬ মে এই শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর অস্থায়ীভাবে টিনের ছাউনি নির্মাণ করে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। বৃষ্টি শুরু হলে টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে বই খাতার ওপর। দমকা বাতাস এলে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে থাকে শিক্ষার্থীরা। তবুও থেমে নেই পাঠদান।
১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় একসময় এলাকার শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। তখন শিক্ষার্থী ছিল ৪৮২ জন। কিন্তু বছরের পর বছর নদীভাঙনে গ্রাম হারিয়েছে মানুষ, উজাড় হয়েছে বসতি। পরিবারগুলো অন্যত্র চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে এখন মাত্র ৭৪ জনে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যালয়ে ছয়জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও দুজন প্রশিক্ষণে থাকায় বর্তমানে চারজন শিক্ষক অস্থায়ী পরিবেশেই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের স্কুলে পৌঁছানো প্রতিদিনের এক সংগ্রাম। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিপু বাবু প্রতিদিন সুজাতপুর চর থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা হেঁটে ঘাটে আসে। এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে আরও প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে পৌঁছাতে হয় স্কুলে।
বিদ্যালয় ভবন নদীতে বিলীন হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ না করতে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে বাঁধের ওপর টিনের চালা নির্মাণ করেছেন শিক্ষকরা। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিন্নাহ আলম বলেন, গত প্রায় ১০ বছরে বিদ্যালয়টি পাঁচবার নদীতে বিলীন হয়েছে। এবার নিয়ে ষষ্ঠবার। নতুন জায়গায় বিদ্যালয় স্থানান্তরের জন্য মাটি ভরাট ও ঘর নির্মাণে সরকারি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টি নতুন স্থানে স্থানান্তর করতে প্রায় ৮০ হাজার টাকার প্রয়োজন।
চকরতিনাথ বিদ্যালয়ই একমাত্র নয়। সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার যমুনা তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীভাঙনের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। কামালপুর, হাটশেরপুর, শিমুলতাইড়, হাসনাপাড়া, ইছামারা, দড়িপাড়া ও কর্নিবাড়িসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও করমজাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
হাটশেরপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য বকুল মিয়া বলেন, গত কয়েক বছরে নদীভাঙনের কারণে চকরতিনাথ, করমজাপাড়া, ধনেরপাড়া, কর্নিবাড়ি ও শিমুলবাড়ি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। মানুষ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, উপজেলার চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয় ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সেটি স্থানান্তরের কাজ চলমান রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, জেলার প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীতীর বর্তমানে ভাঙনের কবলে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে।