সব সংবাদ
জাতীয়

বাংলাদেশে কোকেন ও সিন্থেটিক মাদকের ব্যবহার বাড়ছে, নতুন আতঙ্ক এনপিএস

বাংলাদেশে মাদকের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি এখন কোকেন, ক্রিস্টাল মেথ ও বিভিন্ন সিন্থেটিক ড্রাগের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলো বাংলাদেশকে এখন আর শুধু পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে নয়, বরং মাদকের একটি বড় বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইয়াবা। তবে উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে কোকেন ও ক্রিস্টাল মেথের ব্যবহার। প্রচলিত এসব মাদকের বাইরে এখন নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে এলএসডি, ডিএমটি, কুশ এবং বিভিন্ন ধরনের সিন্থেটিক বা ডিজাইনার ড্রাগ। আন্তর্জাতিক নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড (আইএনসিবি) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে।

২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডিএনসির অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১৩টি অপ্রচলিত মাদক। এগুলো হলো- খাত, আইস, এমডিএমএ, এলএসডি, টাপেন্টটাডল, ট্রামাডল, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ডিওবি, কুশ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হিরোইন, ব্ল্যাক কোকেন ও এমডিএমবি। সিন্থেটিক ড্রাগ বা নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্স (এনপিএস) হলো সাধারণত সিন্থেটিক বা রাসায়নিকভাবে তৈরি মাদক যা হেরোইন, কোকেন, গাঁজা বা একস্ট্যাসির মতো প্রচলিত অবৈধ মাদকের প্রভাব নকল করার জন্য তৈরি করা হয়।

আইএনসিবির ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকায় বিশেষ করে কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায় কোকেনের অবৈধ উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে। উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো এশিয়া ও আফ্রিকার নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কোকেন পরীক্ষার নমুনা বেড়েছে। দক্ষিণ আমেরিকায় উৎপাদিত কোকেন প্রথমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যায়। পরে নাইজেরিয়া, তানজানিয়া ও মালাউইসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের মাধ্যমে আকাশপথে বাংলাদেশে আনা হয়।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের দুটি প্রধান মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল-গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস) এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান) এর মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের প্রধান উৎস মিয়ানমার। মিয়ানমারের শান ও কাচিন রাজ্যের গোপন ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত মাদক নাফ নদী হয়ে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, উখিয়া ও কক্সবাজার উপকূল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ডার্ক ওয়েব ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে এসব মাদক কেনাবেশা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পার্সেলের আড়ালে দেশে প্রবেশ করছে। সম্প্রতি খোদ ঢাকাতেই এসব সিন্থেটিক মাদক তৈরির ল্যাবের সন্ধান পাওয়া গেছে।

২০২০ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাদক মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালে মামলা ছিল ১৭ হাজার ৩০৪টি, আসামি ১৮ হাজার ৩২১ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৪০৯টি মামলা এবং ৩০ হাজার ১৬১ জন আসামি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থলপথে চাপ বাড়লে কারবারিরা এখন সমুদ্রপথকে পাচারের নিরাপদ ও বিকল্প রুট হিসেবে বেছে নিচ্ছে। টেকনাফ ও কক্সবাজারের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র এলাকা এবং পটুয়াখালীর উপকূল দিয়ে মাদকের চালান দেশে প্রবেশের উচ্চঝুঁকি তৈরি হয়েছে।