সব সংবাদ
অন্যান্য

আশুরার গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

মহররম মাসের দশম দিন আশুরা ইসলামি পঞ্জিকায় অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যময় দিন। এই দিনে অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে এবং কারবালায় ইমাম হুসাইনের শাহাদাতবরণ এই দিনের স্মরণে মুসলমানরা আশুরা পালন করে থাকে।

মহররম মাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমে আশুরা’ তথা মুহাররমের দশ তারিখ। ইসলামি পঞ্জিকা অনুযায়ী মহররমের দশম দিনকে আশুরা বলা হয় এবং হাদিসে এই দিনের অনেক ফযিলত বিবৃত হয়েছে। এমনকি ইসলামপূর্ব আরব জাহেলি সমাজে এবং ইহুদি-নাসারাদের মাঝেও এ দিনের বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা ছিল।

ইসলামি ভাষ্য মতে, রমযান মাসের রোযা ফরজ হওয়ার আগে এ মাসের ১০ তারিখে পবিত্র আশুরার দিনে রোজা ফরজ ছিল। পরে তা রহিত করে মাহে রমযানের রোজা ফরজ করা হয়। ইমাম আবু জাফর তাবারি (রহ.) বলেন, ‘ইসলাম আগমনের আগেও জাহিলি যুগে এ ৪টি মাস (জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব) নিষিদ্ধ ছিল। এ মাসগুলোকে তারা পবিত্র মনে করে সম্মান করত, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে নিজেদের বিরত রাখত।’ নবি করিম (সা.) মহররম মাসব্যাপী নফল ইবাদত, রোজা ও তাওবা-ইস্তিগফার করার প্রতি বিশেষ তাগিদ প্রদান করেছেন।

হযরত আবু বাকরাহ্ (রা.) নবি করিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবি করিম (সা.) বলেছেন, ‘বছর হলো বারোটি মাসের সমষ্টি, তার মধ্যে ৪টি অতি সম্মানিত। ৩টি পর পর লাগোয়া জ্বিলকদ, জ্বিলহজ ও মহররম আর (চতুর্থটি হলো) জমাদিউস সানি ও শা’বানের মধ্যবর্তী রজব।’ (সহিহ বুখারি: ২৯৫৮)। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রমযানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহ্র মাস মহররম (মাসের রোজা)। (সহিহ্ বুখারি: ১৯৮২, জামে তিরমিযি: ৭৩৮)। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আরো বর্ণিত আছে, নবি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে মহররমের ৯ ও ১০ তারিখের অবশ্যই রোজা রাখব।’ (সহিহ্ মুসলিম ১/৩৫৯)। মহররম মাসের সম্মানের ব্যাপারে প্রিয়নবি (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ্র মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কেননা, যে ব্যক্তি মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত দান করে সম্মানিত করবেন আল্লাহ্ তা‘আলা নিজে। (সহিহ্ মুসলিম, সুনানে ইবনে মাযাহ্)।

ইসলামের ইতিহাসে কারবালার শোকাবহ ঘটনার আগেও এ দিনে নানা তাৎপর্যময় ঘটনা ঘটেছে। পাশ- ইয়াজিদ বাহিনীর সৈন্যদের হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পরিবার-পরিজন, সঙ্গি-সাথীসহ হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতবরণের মর্মান্তিক ঘটনা ছাড়াও এই দিনে পৃথিবীতে অনেক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে বলে হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে।

বর্ণিত আছে: ১. আল্লাহ্ তা‘আলা এ দিনে আকাশ-জমিন, পাহাড়-পর্বতসহ সমস্ত পৃথিবী সৃষ্টি করেন এবং সর্বপ্রথম বৃষ্টি ও আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হয়। ২. আদি মানব হযরত আদম (আ.)-কে এই দিনে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তিনি পৃথিবীতে আগমন করেন, এই দিনই তাঁর তওবা কবুল করা হয় এবং এই দিনে তিনি স্ত্রী হাওয়া (আ.)-এর সাথে আরাফার ময়দানে সাক্ষাৎ লাভ করেন। ৩. হযরত ইউনুঝ (আ.) এই দিনে ৪০ দিন পর মাছের পেট থেকে আল্লাহ্র রহমতে মুক্তি লাভ করেন। ৪. এই দিনই হযরত নূহ্ (আ.) এর নৌকা মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পেয়ে তুরস্কের জুদি নামক পর্বতে নোঙ্গর করে। ৫. হযরত ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ৪০ দিন পর সেখান থেকে ১০ মহররম মুক্তি লাভ করেন। ৬. দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগ ভোগের পর হযরত আইয়ূব (আ.) দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভ করেন। ৭. হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.) তাঁর ১১ ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে কূপে পতিত হন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ ৪০ বছর পর ১০ মহররম তারিখে পিতার সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন। ৮. হযরত ইদ্রিস (আ.) এই দিনে সশরীরে জান্নাতে প্রবেশ করেন। হযরত মূসা (আ.) এই দিনে তাওরাত কিতাব লাভ করেন, ফিরআউনের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেন এবং এই দিনে অভিশপ্ত ফিরআউনকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। ৯. হযরত দাউদ (আ.) আল্লাহ্র কাছ থেকে ক্ষমা লাভ করেছিলেন এবং বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন এই দিনে। ১০. হযরত সুলায়মান (আ.) তাঁর হারানো রাজত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছিলেন এই দিনে। ১১. পবিত্র আশুরার দিনে ফিরআউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া শিশু মুসা (আ.)-কে গ্রহণ করেন। ১২. এই দিনে হযরত ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর জাতির লোকেরা তাঁকে হত্যা চেষ্টা করলে আল্লাহ্পাক তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে মুক্তি দান করেন। ১৩. কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.) পরিবার-পরিজনসহ শাহাদাত বরণ। এছাড়াও হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে, মহররম মাসের ১০ তারিখ আশুরার দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।

ইসলামের ইতিহাসে ১০ মহররম তারিখটির নানা গুরুত্ব ও তাৎপর্য থাকলেও কারবালায় ঘটে যাওয়া সর্বশেষ মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণেই বর্তমান দুনিয়ার মুসলমানেরা দিনটি পালন করে থাকে। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং এ জন্য ষড়যন্ত্র ও শক্তি ব্যবহারের পথ বেছে নেন। চক্রান্তের অংশ হিসেবে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আরেক দৌহিত্র হযরত ইমাম হাসান (রা.)-কে বিষপান করিয়ে হত্যা করা হয়। একই চক্রান্ত ও নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতায় ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পরিবার-পরিজন ও ৭২ জন সঙ্গীসহ শাহাদাতবরণ করেন হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)। তাঁদের হত্যার ক্ষেত্রে যে নির্মম-নিষ্ঠুর পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, ইতিহাসে এর নজির বিরল। অসহায় নারী ও শিশুদের পানি পর্যন্ত পান করতে দেয়নি ইয়াজিদ বাহিনী। বিষাক্ত তীরের আঘাতে নিজের কোলে থাকা শিশুপুত্র আলী আসগরের মৃত্যুর পর আহতবস্থায় অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহিদ হন হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)। আশুরার এই ঐতিহাসিক ঘটনার মূল চেতনা হচ্ছে ক্ষমতার লোভ, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য চক্রান্ত ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর উদ্দেশ্য ও আদর্শ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করাই হবে এ ঘটনার সঠিক মর্ম অনুধাবনের বহিঃপ্রকাশ। অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আপোসহীন অবস্থান ও ত্যাগের যে শিক্ষা কারবালা মানবজাতিকে দিয়েছে, তা আজকের দুনিয়ার অন্যায় ও অবিচার দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

আশুরার দিনে অনেক আম্বিয়ায়ে কিরাম আল্লাহ্পাকের সাহায্য লাভ করেন এবং কঠিন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি লাভ করেন। এই সাহায্যের শুকরিয়া হিসেবে নবি-রাসূলগণ এবং তাঁদের উম্মতগণ এ দিনে রোজা পালন করতেন। যেহেতু আশুরার দিনটি অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যময় দিন, তাই এ দিনে উম্মতে মুহাম্মদী হিসেবে বিশেষ নেক আমল করা অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ।

আমাদের এই উপমহাদেশের সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে মহররম মাস সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন— এ মাসে জমিতে হাল-চাষ না করা, মাটি না কাটা, বাঁশ-ঘাস-কাঠ ইত্যাদি না কাটা, বিয়ে-শাদি না করা, নতুন ও সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছেদ না পরা, সাদা অথবা কালো কাপড় তথা শোকের পোশাক পরা, নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ না করা, গোশ্ত না খাওয়া ও নিরামিষ আহার করা, কোনো শুভ কাজ বা ভালো কাজের সূচনা না করা, সব ধরনের আনন্দ উৎসব পরিহার করা, কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে না যাওয়া— এগুলো সবই কুসংস্কার ও কুরআন-হাদিসের সাথে এসবের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

পরিশেষে বলা যায়, মহররমের শিক্ষা হল অন্যায়-দূরাচারের বিরুদ্ধে আদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনা করার শিক্ষা। জালিমের বিরুদ্ধে মাজলুমের অকুতোভয় লড়াইয়ের সাহস সঞ্চার করার শিক্ষা।

মূল প্রতিবেদন (Reference): পবিত্র আশুরার চেতনা — Daily Inqilab