সব সংবাদ
অন্যান্য

পবিত্র আশুরার শিক্ষা: ইতিহাসের সত্য ও ন্যায়ের পথে ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগ

১০ মহররম, পবিত্র আশুরা বিশ্ব ইতিহাসে একটি তাৎপর্যময় দিবস। ৬১ হিজরীর এই দিনে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদের অত্যাচারী বাহিনীর হাতে ইমাম হোসাইন (রা.) সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন। এই শোকাবহ ঘটনা থেকে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতী মোহাম্মদ শফি (রহ.) ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উল্লেখ করেছেন।

পবিত্র আশুরা বিশ্ব ইতিহাসে স্মরণীয় ও তাৎপর্যময় দিবস। মহানবী (সা.)-এর পূর্বেও এদিনে বিভিন্ন নবীদের জামানায় অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। তবে সকল ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে নির্মম ঘটনা ঘটেছে ৬১ হিজরীর ১০ মহররমে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে।

এদিনে মহানবী (সা.)-এর কলিজার টুকরা আহলে বাইতের প্রজ্জলিত দীপশিখা ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (রা.) ইয়াজিদের লেলিয়ে দেওয়া হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম-নৃশংসভাবে শহীদ হয়েছেন। এ শাহাদাতের ঘটনা বিশ্বব্যাপী সকল তৌহিদবাদী মুসলমানদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করেছে। দ্বীন ইসলামের মশালকে আরো আলোকোজ্জ্বল করেছে। কিয়ামত পর্যন্ত সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে চিরন্তন প্রেরণা যোগাচ্ছে।

ইসলামী আন্দোলনের সেরা শহীদ শহীদে কারবালার ঘটনাসমূহ জানার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রকৃত শিক্ষা ও তাৎপর্যকে উপলব্ধি করা ও বাস্তবে মেনে চলা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের শহীদে কারবালাকে মূল্যায়ন করতে হলে আমাদেরকে একটু পেছনে যেতে হবে। হযরত আলী (রা.)-এর খিলাফতের সময়েই কুফার গভর্নর হযরত মোয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) নানা অজুহাতে খলিফার আনুগত্য না করে দামেস্কভিত্তিক আলাদা রাজতন্ত্রের বীজ বপন করেন। একক ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং মুসলিম ঐক্যে এখান থেকেই ভাঙন শুরু হয়।

বিচ্ছিন্নতাবাদী উগ্র খারেজীদের হাতে হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর তিনি ইসলামী জাহানের একচ্ছত্র শাসকের আসন লাভ করেন। তার শাসনকালের শেষ দিকে পুত্র ইয়াজিদকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করার জন্য সকল ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেন। নিজের জীবদ্দশায় তিনি ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে সকলের কাছ থেকে 'বাইয়াত' (আনুগত্য) অর্জনের সব রকমের চেষ্টা চালান।

এজিদের পক্ষে বায়আত গ্রহণের চেষ্টায় অন্যান্য এলাকায় সফল হলেও মক্কা-মদীনায় তিনি সফল হননি। এক্ষেত্রে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ছাড়াও আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর সহ নেতৃস্থানীয় সাহাবী ও ব্যক্তিত্বগণ ইয়াজিদকে ক্ষমতাসীন করার তীব্র বিরোধিতা করেন।

হযরত মোয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পরে ইয়াজিদ তাদের বাইয়াত (আনুগত্য) অর্জনের জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠে। মদীনার গভর্নর ওয়ালিদ ইবনে উৎবাকে এ ব্যাপারে কড়া চিঠির মাধ্যমে নির্দেশ দেয়। ওয়ালিদ হযরত হোসাইন (রা.)-কে ডেকে এনে ইয়াজিদের চিঠি শুনিয়ে বাইয়াতের জন্য অনুরোধ জানান। এসময় হযরত হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গে ছিল হাশেমী বংশের ১৯ জন শক্তিশালী যুবক। তিনি ঘৃণাভরে ইয়াজিদের আনুগত্যের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বীরদর্পে চলে যান।

অনেকে হযরত হোসাইন (রা.)-এর কুফা গমনকে অদূরদর্শী ও হঠকারী সিদ্ধান্ত বলে সমালোচনা করেন। আসলে মোটেই তা সত্য নয়। ইমাম সবদিক চিন্তা ভাবনা করে তার পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ইয়াজিদ হযরত হোসাইন (রা.)-কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য ইমামের নিকট ছিল। হজ্বের সময় আরাফার ময়দানে তাকে হত্যার জন্য গুপ্তঘাতক নিয়োগ করেছিল। তাই হজ্বের আগের দিন ৮ জিলহজ্ব ইমাম মক্কা ত্যাগ করে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন।

অন্যদিকে খেলাফতের আমল থেকে কুফা ছিল সামরিক ও বাণিজ্য নগরী। তাই এখানেই হযরত আলী (রা.) রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। কুফাবাসী বারবার প্রতিনিধি ও পত্র পাঠিয়ে ইমামকে কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ইমাম তাঁর চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকিলকে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখার জন্য কুফায় পাঠিয়েছিলেন। কুফার ১৮ হাজার মানুষ মুসলিম বিন আকিলের হাতে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পক্ষে ইয়াজিদের সঙ্গে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বায়আত করেছিলেন।

কুফাবাসী গণভাবে ইমামকে সমর্থন দিয়ে তাঁর আগমনের অপেক্ষায় ছিল। এমতাবস্থায় ইয়াজিদ নোমান বিন বশিরকে বাদ দিয়ে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার গভর্নর করে পাঠালে তাঁর নৃশংসতা, হত্যা, সন্ত্রাসের ফলে কুফাবাসী ভয়ে চুপসে যায়। পরিস্থিতি পাল্টে যায়। মুসলিম বিন আকিল বন্দী হন এবং শাহাদাত বরণ করেন।

অন্যদিকে ইতোমধ্যেই ইমাম ৮ জিলহজ্ব কুফা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। প্রবীণ সাহাবাগণ তাকে বারণ করেছিল ঠিকই, কিন্তু ইমাম সবকিছু ভেবে তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কারণ, এ প্রেক্ষাপটে এর বিকল্প একটাই ছিল ইয়াজিদের কাছে বাইয়াত হওয়া অথবা মক্কার জমিনকে রণক্ষেত্র বানিয়ে পবিত্র হেরেমের অসম্মানের কারণ হওয়া। ইমাম সবকিছু জেনে বুঝে প্রতিবাদ সংগ্রাম ও শাহাদাতের রাস্তায় অগ্রসর হন।

ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কুফা গমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতী মোহাম্মদ শফি (রহ.) বলেছেন, ইমামের উদ্দেশ্য ছিল: ১। কুরআন সুন্নাহর আইন যথাযথভাবে প্রচলিত করা। ২। পুনরায় ইসলামের ইনসাফ কায়েম করা। ৩। ইসলামে নবুয়ত পদ্ধতির খেলাফতের স্থলে রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিদায়াত ঠেকানোর জন্য একাধারে জ্বিহাদ পরিচালনা অব্যাহত রাখা। ৪। ন্যায়ের মোকাবিলায় অর্থ শক্তির প্রদর্শনী দেখে ভীত না হওয়া। ৫। ন্যায়ের সংগ্রামে নিজের জানমাল সন্তানাদি সবকিছু কুরবান করে দেওয়া। ৬। ভয়ভীতি ও বিপদে বিচলিত না হওয়া। আর সকল অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা এবং একমাত্র তাঁর প্রতি ভরসা রাখা।

এক কথায় হযরত হোসাইন (রা.) মহানবী (সা.)-এর রেখে যাওয়া 'দ্বীন' উমাইয়াদের হাতে পরে যে ক্ষতিগ্রস্থ ও বিকৃতির শিকার হয়েছিল তার থেকে উদ্ধারের লক্ষ্যে তার সংস্কার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা আর অন্যায়ের প্রতিরোধই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। সত্য পথের সিপাহাসালার হিসেবে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সামান্য পিছপা হননি তার মিশন থেকে।

কারবালার যুদ্ধে মূলত ইবনে জেয়াদের নেতৃতে ইয়াজেদী রাষ্ট্র শক্তি একজন মহান ব্যাক্তিকে তাঁর পরিবারসহ নির্মূল করার প্রয়াস চালিয়েছে। সেখানে একে একে যুদ্ধ করে ঐ পরিবারের প্রায় সকল পুরুষ অনেক শত্রু সেনাকে নিহত করে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে শহীদের কাফেলায় শরিক হয়েছেন। মূল টার্গেট হযরত হোসাইন (রা.) নিজেও একইভাবে ধৈর্য্য ও ইমানের উপর অবিচল থেকে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন।

এই পরিস্থিতিতেও ইমানের উন্মেষ ঘটার কারণে ইবনে জেয়াদের অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান 'হুর' সপক্ষ ত্যাগ করে হযরত হোসাইন (রা.)-এর পক্ষে এসে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়েছেন। অথচ, এই হুরের নেতৃত্বেই হযরত হোসাইন (রা.)-এর পথ রোধ করে তাকে কারবালায় আসতে বাধ্য করা হয়েছিল। এসব ঘটনার মধ্যেই রয়েছে আদর্শ পিয়াসী মুমীনের জন্য বিশেষ শিক্ষা।

মহান আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবীদের পাঠিয়ে মহা সত্যের বাস্তবায়নের জন্য যে নবুয়তী ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে তাঁর সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু নবুয়তী ধারায় কার্যক্রম মানব জাতির মধ্যে বহমান রাখার জন্যই মহানবী (সা.)-এর অতি আদরের দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.) দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন।

দুষ্ট-দুরাচার ইয়াজিদের উপর ভর করা তাগুতী শক্তির কাছে তিনি মাথা নত করেননি। দ্বীনকে রাহু গ্রাসের হাত থেকে রক্ষার সংগ্রামে নিজের পরিবার-পরিজনসহ শাহাদাতের কাওসার পান করেছেন। আপাত দৃষ্টিতে খোদাদ্রোহী ইয়াজেদী শক্তির উপর বিজয়ী হতে না পারলেও চূড়ান্তভাবে তিনিই কামিয়াব হয়েছেন। পৃথিবীর সকল দেশে সকল ঈমানদার মুসলমানরা তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করে সত্যের পথে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা পাচ্ছে।

আজকের দিনেও যারা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের উচ্ছেদ চায়। ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আধ্যাত্মিকতার উঁচু স্তরে উঠতে চায়, তাদের অবশ্যই ইমাম হোসাইন (রা.)-এর জীবনকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মহানবী (সা.)-এর ওফাতের মাত্র অর্ধশত বছরের ব্যবধানে ইসলামের খুঁটিতে যে ঘুনে ধরেছিল তা মুক্ত করার জন্য ইমাম হোসাইন (রা.)-কে জীবন দিতে হয়েছে।

আজ দেড় হাজার বছরের ব্যবধানে ইসলামের মধ্যে অনেক বড় বড় ঘুনপোকা বাসা বেঁধেছে। এদের কবল থেকে সত্য দিনকে বাঁচাতে হলে, মহানবী (সা.)-এর রেখে যাওয়া দ্বীনের পুনঃ মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে আজকের হোসাইনদেরকেও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুতে হবে। সকল লোভ প্রলোভন থেকে মুক্ত হয়ে আধ্যাত্মিকতার শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে প্রয়োজনে জীবন-সম্পদ সবকিছু বিলিয়ে দিতে হবে। মহান আশুরার এটাই প্রকৃত শিক্ষা।

মূল প্রতিবেদন (Reference): পবিত্র আশুরার শিক্ষা — Daily Inqilab