উপকূলের নারীদের স্বাবলম্বনের গল্প: মাচায় ছাগল পালনে সফল আনোয়ারা
চরফ্যাশনের প্রত্যন্ত গ্রামের বিধবা নারী আনোয়ারা বেগম পিকেএসএফ ও জিসিএফ-এর যৌথ প্রকল্পের আধুনিক মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন প্রশিক্ষণ নিয়ে সফল হয়েছেন। মাত্র ২০ হাজার টাকা ঋণে শুরু করা তার খামার এখন গ্রামের নারীদের অনুপ্রেরণার উৎস।
চরফ্যাশন উপজেলার বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীরে চর মানিকা ইউনিয়নের চর আইচা গ্রামে বসবাস করেন আনোয়ারা বেগম। স্বামী হারানোর পর ছোট ছেলে ও বৃদ্ধ মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব একাই তার কাঁধে এসে পড়ে। অভাবের সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা দূরের স্বপ্ন মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই তার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ)-এর আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত 'আরএইচএল প্রকল্প'।
এই প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা বেগম আধুনিক উঁচু মাচার ছাগলের ঘর এবং জলবায়ু-সহনশীল পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পান। প্রশিক্ষণ শেষে ২০,০০০ টাকার ঋণ নিয়ে তিনি তার খামার শুরু করেন। অক্লান্ত পরিশ্রম ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে তার খামারে ছাগলের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
গত ঈদুল আজহায় তিনি তার খামারের ২টি সুস্থ ছাগল বেশ ভালো দামে বিক্রি করেন, যা তার আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের যাত্রায় এক বিশাল মাইলফলক। আনোয়ারার এই সাফল্য শুধু তার পরিবারকেই বদলে দেয়নি, পুরো গ্রামের নারীদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
আনোয়ারা বেগম বলেন, 'আগে আমরা সাধারণ পদ্ধতিতে ছাগল পালতাম, প্রায়ই অসুখে মারা যেত। এখন মাচা পদ্ধতিতে পালনায় রোগবালাই প্রায় হয় না, তাই আমরাও লাভবান হচ্ছি।'
ইতোমধ্যে চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলায় ১৯টি ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার নারীকে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ৬২৫ জন সদস্যকে মাচা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
পরিবার উন্নয়ন সংস্থার (এফডিএ) প্রকল্প সমন্বয়কারী মেহেদী আজম বলেন, 'আধুনিক প্রযুক্তি ও মাচা পদ্ধতির সমন্বয়ে ছাগল পালন শুধু লাভজনক নয়, এটি টেকসই কৃষি ও গ্রামীণ সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত।'
এফডিএ-এর সিনিয়র প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী শংকর চন্দ্র দেবনাথ বলেন, 'আমাদের মূল লক্ষ্য গ্রামীণ নারীদের মধ্যে টেকসই সক্ষমতা তৈরি করা। মাচা পদ্ধতি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর।'
চরফ্যাশন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা রাজন আলী বলেন, 'মাচা পদ্ধতি একটি বিজ্ঞানসম্মত ও লাভজনক উপায়। অল্প জায়গায় অধিক ছাগল পালন করা যায় এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।'
এক সময়ের অসহায় আনোয়ারা বেগম আজ একজন সফল খামারি ও উদ্যোক্তা। তার একটি ছাগল থেকে শুরু হওয়া খামার এখন পুরো চরফ্যাশন ও মনপুরার দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য স্বপ্ন দেখার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।