বড় কর্পোরেশনের কর ফাঁকি: সরকারের পাওনা ১৩ হাজার কোটি টাকা
আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত দুই দশকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কখনোই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এবারের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। দেশের প্রধান চারটি মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের পাওনা ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা।
আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি খুব বড় লক্ষ্যমাত্রা হলেও বিগত বছরগুলোতে এনবিআরের রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ব্যর্থতা রয়েছে। বলা যায়, গত দুই দশকে কখনোই রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এবারো একতৃতীয়াংশের বেশি ঘাঁতি নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।
দেশে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে টিন নাম্বার বা নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা এক কোটির বেশি হলেও আয়কর রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা মাত্র ৪৬ লাখ। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, দেশে কোম্পানি করদাতার সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি নয়।
সংকটময় অর্থনৈতিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে হলে রাজস্ব ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে। প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়, দেশের প্রধান চারটি মোবাইল ফোন অপারেটিং কোম্পানি গ্রামীণফোন, টেলিটক, রবি এবং বাংলালিংকের কাছে সরকারের পাওনা ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী এ তথ্য জানিয়ে বলেন, গ্রামীণফোনের কাছে সরকারের পাওনা ৬ হাজার ১০২ কোটি, দেশীয় কোম্পানি টেলিটকের কাছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি, রবি টেলিকমের কাছে ৬১৫ কোটি এবং বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন্সের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে।
টেলিটক বাদে বাকি কোম্পানিগুলো বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার লভ্যাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় নিজ নিজ দেশে নিয়ে গেলেও তারা এদেশের জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। রাজস্ব ফাঁকি, বকেয়া এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, অস্বচ্ছতা, কলরেট ও ডেটা প্রতারণার মাধ্যমে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে। অন্যদিকে দেশীয় কোম্পানি টেলিটক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিচ্ছে।
এসব কোম্পানিকে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করে এ খাতে প্রতিযোগিতামূলক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। অন্য তিনটি কোম্পানি লাভ করলেও টেলিটকের লোকসানের কারণ উদঘাটনে তদন্তসাপেক্ষে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
প্রকাশিত এক তথ্যে জানা যায়, সরকারের বিভিন্ন সেক্টরের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া অর্ধ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। ফ্যাসিস্ট আমলের দেড় দশকে দেশ থেকে ২৩৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। টাকার অংকে তা ২৮ লাখ কোটি টাকার বেশি। এ সময়ে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের পাওনা ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।
এসব খেলাপি ঋণ ও সরকারের পাওনা আদায়ের কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারলে সরকারের ঋণের বোঝা কমিয়ে আনা সম্ভব। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ব্যাংকিং জালিয়াতি ও অর্থপাচার বন্ধ করতে না পারলে সরকারের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হতে পারে।