সব সংবাদ
ফেনী

ফেনীতে জুলাই আন্দোলন: একটি প্রত্যক্ষ বর্ণনা

ফেনীতে জুলাই আন্দোলনের সময়কালীন বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী। আন্দোলনের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পুলিশের গুলিতে ১১ জন নিহত হওয়ার বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করেছেন তিনি।

ফেনীতে জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল ফেনী পলিটেকনিকের ছাত্রদের রেললাইন অবরোধের মাধ্যমে। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মাস্টার তাহমিদ। এর আগে ফেনী সরকারি কলেজের আব্দুল আজীজ, তাজিম ও আশিকের নেতৃত্বে ডিসি অফিসে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

১৭ জুলাই ট্রাংক রোডে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়। সকাল থেকেই শহীদ মিনারের সামনে ছাত্রলীগের কঠোর অবস্থান ছিল। সন্দেহ হওয়া যাকেই তারা চার্জ করত এবং মারধর করত। মহিপাল কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল আহাদ জানান, ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে মারধর করে শহীদ মিনার থেকে পিটিআই স্কুল মাঠে আটকে রাখা হয়েছে।

দুপুর ১২টায় ফেনী কোটা আন্দোলনের নেতৃত্বে ভিতরের বাজার থেকে শিক্ষার্থীদের একটি মিছিল বের হয়। মিছিল দোয়েল চত্বর পের হওয়ার সময় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হকিস্টিক, স্ট্যাম ও বাঁশ দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করে। পুলিশ ছিল নিরব দর্শক। এই হামলায় নারী শিক্ষার্থীদের উপরও হামলা করা হয়। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা পিটিআই স্কুল থেকে আটজন শিক্ষার্থীকে ছাড়িয়ে আনে।

১৮ জুলাই দাউদপুল থেকে বড় মসজিদ পর্যন্ত মিছিল হয়। ১৯ জুলাই জুমার পর জহিরিয়া মসজিদ থেকে ফেনী বড় মসজিদ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলে জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাউদ্দিন মামুনসহ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করে। বড় মসজিদের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারস্যাল নিক্ষেপ করে। এতে ৪ জন শিক্ষার্থী আহত হয়।

২০ জুলাই পৌরসভার ১০ নং ওয়ার্ডের স্থানান্তরিত জনশক্তি আব্দুল্লাহ আল সামি মিরপুরে আহত হন। পরবর্তীতে যোবায়ের ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ হয়। তিনি জানান, যারা স্মারকলিপি ও ট্রাংক রোডে আন্দোলন করছে তাদের অধিকাংশের পরিবারকে হয়রানি করা হচ্ছে এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তল্লাশী করছে।

২৫ জুলাই যোবায়ের ভাই ইমার্জেন্সি দেখা করার জন্য ডাকেন। ২৬ জুলাই গায়েবানা জানাযার আয়োজন করা হয়। ফালাহিয়া মাদ্রাসা সেক্রেটারী সাইমুম ভাই জানাযায় ইমামতি করেন। সন্ধ্যায় খবর আসে এনআইএসআইসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বিশেষ বাহিনী সাইমুম ভাইকে গ্রেফতার করতে চাইছে। ভাইকে মোবাইল ও বাসস্থান পরিবর্তন করতে বলা হয়।

১ আগস্ট ৩২ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রের কর্মসূচিতে মোমবাতি প্রজ্বলন করার সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী পুলিশলীগরা শিক্ষার্থীদের ভিতরের বাজার থেকে বের হতে দেয়নি।

২ আগস্ট ৩৩ জুলাই ফেনীতে এত বিশাল শিক্ষার্থীদের মিছিল হয়। এই মিছিলে নারী শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। জহিরিয়া মসজিদ থেকে শুরু হওয়া মিছিল ইসলাম রোডের মাথায় পৌঁছানোর সাথে ১৯ জুলাই পুলিশের হামলার কথা স্মরণ করে বুয়া বুয়া স্লোগান দেওয়া হয়।

৩ আগস্ট ৩৪ জুলাই কেন্দ্র ঘোষিত এক দফা দাবী নিয়ে আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয় ৪ আগস্ট আন্দোলন করতে হবে। শৃঙ্খলা বিভাগের কাজের মধ্যে ছিল ইট, বাঁশ সহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা, ৬টি শৃঙ্খলা গ্রুপ গঠন করা, মাইকের ব্যবস্থা করা এবং লিপলেট প্রিন্ট ও বিতরণ করা।

৪ আগস্ট ৩৫ জুলাই সকাল ১১:৩০ মহিপালের চট্টগ্রাম বাস কাউন্টার থেকে স্লোগান শুরু হয়। হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। মহিপাল ব্যবসায়ীরা আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার পানি নিয়ে আসে।

যোহরের নামাজের সময় আন্দোলনকারীদের একাংশ নামাজে দাঁড়ালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পেটুয়াবাহিনী নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপর গুলি করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা নিরব ভূমিকা পালন করে চলে যায়। মুহূর্তের মধ্যে অজস্র গুলিবর্ষণে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দেড় ঘন্টারও অধিক ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় তাৎক্ষণিক ১১টি লাশ পড়ে।

পরবর্তীতে শহরের সদস্য নুর হোসেন ভাই গুলি খেয়েছে, কয়েজন ভাই আহত হয়েছে। তাদেরকে মেডিনোভা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সঠিক চিকিৎসা না হওয়ায় আল কেমি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সদর হাসপাতাল ও ফেনী ডায়াবেটিস হাসপাতালে আহতদের উপর পুলিশ আবার হামলা করেছে।

মাগরিবের মধ্যে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাংবাদিক শাহাদাত জানান, এ পর্যন্ত ১১ জনের নাম জানতে পেরেছেন। রাত ৮:০০টায় হাসপাতাল থেকে বের হই।

এই ফেনীর নির্মম হত্যাকান্ড ফেনীর ইতিহাসে এক ভয়াল দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কিন্তু মাত্র বছরখানেকের মধ্যেই খুনিরা কোর্ট থেকে বিভিন্নভাবে জামিন নিয়ে নিচ্ছে, যা ফেনীর জনপদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই আন্দোলনের একজন সহযোগী হিসেবে এই নির্বিচারে নির্মম হত্যাকান্ডের সকল সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবী করছি।

মূল প্রতিবেদন (Reference): জুলাইয়ে নিস্তব্ধতার দিনগুলো - দৈনিক ফেনীর সময় — ফেনীর সময়