জাতীয় মূল্যায়নে উদ্বেগজনক চিত্র: মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতায় ব্যাপক পতন
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সর্বশেষ জাতীয় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে মৌলিক শিক্ষণ দক্ষতা ও চিন্তা ক্ষমতায় মারাত্মক ধস নেমেছে। মুখস্থ বিদ্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সিংহভাগ শিক্ষার্থীই বিশ্লেষণী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানে চরম ঘাটতিতে ভুগছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালিত ‘ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস (নাস)’ প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলার প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী এই সমীক্ষায় অংশ নেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখস্থ বিদ্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সিংহভাগ শিক্ষার্থী বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো প্রধান বিষয়গুলোতে সাধারণ সমস্যা সমাধান এবং বিশ্লেষণী চিন্তার দক্ষতায় চরম ঘাটতিতে ভুগছে। এমনকি পরীক্ষার হলে সাধারণ রিডিং প্যাসেজ বুঝতে এবং মৌলিক জ্যামিতিক ও গাণিতিক হিসাব মেলাতেও হিমশিম খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
সাধারণ স্কুলগুলোর তুলনায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বাংলায় সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে। ইংরেজি ভাষায় নিজস্বভাবে লেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি এতটাই প্রকট যে, প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই মেধার শীর্ষ স্তরে পৌঁছাতে পারছে না। ভৌগোলিক বৈষম্যের কারণে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ইংরেজির স্কোর তলানিতে নেমে গেছে, যার মধ্যে রংপুর ও ময়মনসিংহের শিক্ষার্থীদের ফলাফল সবচেয়ে দুর্বল। গণিতের ক্ষেত্রেও চিত্রটি বেশ হতাশাজনক; দেশের মাত্র ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতের শীর্ষ স্তরে জায়গা করে নিতে পেরেছে। বিশেষ করে জ্যামিতিক ধারণার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শূন্যতা দেখা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে অষ্টম ও দশম উভয় শ্রেণিতেই বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা ও গণিতে এই পতনের হার সবচেয়ে বেশি। বাংলা ভাষায় অষ্টম শ্রেণির গড় স্কেল স্কোর ৪০৪ এবং দশম শ্রেণিতে ৪১৩। ইংরেজিতে অষ্টম শ্রেণির গড় স্কেল স্কোর ৩৭৯ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০২। গণিতে অষ্টম শ্রেণিতে গড় স্কেল স্কোর ৩৯২ এবং দশম শ্রেণিতে ৪২৫।
শিক্ষার্থীদের মেধার এই মূল্যায়নে বিভাগগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য পাওয়া গেছে। সার্বিক ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলা ও গণিত উভয় বিষয়েই গড় স্কোরে দেশের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে খুলনা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগ। তবে ইংরেজির ক্ষেত্রে এককভাবে শীর্ষস্থান দখল করেছে চট্টগ্রাম বিভাগ। বিপরীতে, প্রায় সব বিষয়েই এবং উভয় শ্রেণিতেই দেশের সবচেয়ে নিম্ন অবস্থানে রয়েছে সিলেট বিভাগ।
লিঙ্গ, অঞ্চল ও প্রাতিষ্ঠানিক ধরনের ক্ষেত্রেও মূল্যায়নে বড় বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। ভাষা দক্ষতার ক্ষেত্রে ছাত্ররা পিছিয়ে থাকলেও ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। তবে গণিত ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে কোনো লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান পাওয়া যায়নি। শহরের শিক্ষার্থীরা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় সব বিষয়েই উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্থ স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা শিক্ষার শিক্ষার্থীদের চেয়ে সব বিষয়েই ভালো স্কোর করেছে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই গুণগত ঘাটতি ও বৈষম্য পূরণে মাউশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু পাসের হার বা এনরোলমেন্ট বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও শিখনফল নিশ্চিত করতে হবে। বিভাগীয় ও শহর-গ্রামের বৈষম্য দূর করতে গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানবিক ও প্রযুক্তিগত সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে মাউশি।