সব সংবাদ
অর্থনীতি

যুদ্ধবিরতির পর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে পড়েছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটে পড়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। যুদ্ধবিরতির পর তেলের দাম কমে ৮০ ডলারের নিচে নেমে যাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছিল। বিশেষত হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তাসহ বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিপর্যয়ের ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টালমাটাল হয়ে পড়েছিল। বিশ্বের সব শেয়ারবাজারে দরপতন এবং তেলের মূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অগ্রসর পশ্চিমা দেশগুলো বড় ধরনের সংকট ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছিল। সেই সাথে জনবহুল দরিদ্র দেশগুলো ভয়াবহ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের জন্য কিছুটা ছাড় দেয়ার কারণে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে কোনোমতে রক্ষা পেলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানির ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি এবং মার্কিন অবরোধের কারণে দেশীয় বাজারে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষকে। যুদ্ধ এবং অবরোধ অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি ও জনদুর্ভোগ কোথায় গিয়ে পৌঁছাতো তা সহজেই অনুমেয় ছিল। অবশেষে যুদ্ধ বিরতির সমঝোতা ও খসড়া চুক্তিতে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বিশ্ব একটি নতুন বাস্তবতা ও সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ও প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই বিশ্বের তেলের বাজারে বড় ধরনের দরপতন ও সরবরাহ লাইন অবারিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জনজীবনে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে।

যুদ্ধের আবহে আমাদের সরকার প্রথমেই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত না নিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। কিন্তু যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ প্রলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির বাস্তবতায় জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে বাধ্য হয়। দেশের মানুষের আয় না বাড়লেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহনসহ উৎপাদনের প্রতিটি খাতে ও পণ্যে মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। অবশেষে যুদ্ধবিরতি হওয়ায় জ্বালানি তেল, এলএনজি, সার এবং খাদ্যমূল্যে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ব্যারেল প্রতি ক্রুড পেট্রোলিয়ামের মূল্য ১২০ ডলার থেকে ৮০ ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার বাস্তবতা জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে স্বস্তি নিয়ে এসেছে। বৈশ্বিক বাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে দেশীয় বাজারে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করার কথা থাকলেও তার উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না। তেল ও সারের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে দেশের কৃষি ও শিল্পোৎপাদনে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে। সেই সাথে চাহিদা, উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনের সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, অর্জন ও সমন্বয় নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে। যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা আমাদের অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থা কি ধরনের সংকট ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল, তা পর্যালোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সঠিক নীতিমালা ও কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষত জ্বালানির আভ্যন্তরীণ উৎসগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আপৎকালীন জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় তহবিল ও অন্তত ৬ মাসের জন্য বৃহদাকার রিজার্ভ গড়ে তোলা ও তেল শোধনাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করতে হবে। সমুদ্রের ব্লকগুলো থেকে জ্বালানি উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

দেড় দশকের স্বৈরশাসন ও লুটপাটতন্ত্রের কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার একটি বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্তরাধিকার বহন করছে। এমনিতেই দেউলিয়া ও ভগ্নপ্রায় অর্থনীতিকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে খুব সহজ বিষয় নয়। তদ্বোপরি ইরান যুদ্ধের খড়গ নেমে আসার কারণে দেশের অর্থনীতিতে এক অশনি সংকেত নেমে এসেছিল। যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে সে মেঘ অনেকটা কেটে গিয়ে আমাদের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত অবারিত হতে চলেছে। তবে এর জন্য সরকারকে ত্বরিৎ গতিতে অর্থনৈতিক সংস্কারসহ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ব্যবস্থায় কার্যকর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্টে জানা যায়, নানাভাবে দেশ থেকে অর্থপাচার এখনো অব্যাহত রয়েছে। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর মানে হচ্ছে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ব্যবস্থা ও নেপথ্যের কুশীলবরা এখনো সক্রিয় রয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচি হওয়া উচিৎ আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের নামে ভুয়া ইনভয়েস এবং ব্যাংক ঋণের জালজালিয়াতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান সুদৃঢ় করা। বিশেষত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পরিধি বিস্তৃত করার সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। সেই সাথে মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও জাপানের মত বাজারে জনশক্তি ও রফতানি বহুমুখীকরণের পাশাপাশি শিক্ষাবৃত্তিসহ পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রসমুহ আরো বিস্তৃত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। পতিত স্বৈরাচারের দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, সুশাসন ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি রোধ করার মাধ্যমেই কেবল বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সমমর্যাদায় অংশগ্রহণমূলক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনের সাথে যেসব সমঝোতা ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার দরজা উন্মোচিত হয়েছে, তা আরো জোরদার ও ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখতে হবে। বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরকে সংস্কার ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।