সব সংবাদ
বিনোদন

ফারুক আহমেদের মঞ্চে প্রত্যাবর্তন ও বাংলাদেশের স্ক্রিপ্ট রাইটার সংকট

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় জগতে সক্রিয় ফারুক আহমেদ সম্প্রতি ঢাকা থিয়েটারের হয়ে নির্দেশক হিসেবে মঞ্চে ফিরেছেন। তবে তিনি মনে করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটারের তীব্র অভাব রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনেতা ফারুক আহমেদ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছেন। সম্প্রতি ঢাকা থিয়েটারের হয়ে ‘রঙমহাল’ নাটক দিয়ে নির্দেশক হিসেবে মঞ্চে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে তার এবং নাটকটি দর্শকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন।

ঢাকা পোস্টের সাথে আলাপচারিতায় ফারুক আহমেদ জানান, তিনি ১৯৮৩ সাল থেকে ঢাকা থিয়েটারের সাথে যুক্ত। তার আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে নির্দেশনার কাজ করেছিলেন। ঢাকা থিয়েটারের দলপ্রধান বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব নাসীর উদ্দিন ইউসুফ এবং বিশিষ্ট নাট্যকার সেলিম আল দীনের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এই দলে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, শিমুল ইউসুফ, আফজাল হোসেন, হুমায়ুন ফরীদি, সুবর্ণা মুস্তাফা, শমী কায়সার, জহির উদ্দিন পিয়ার, কামাল বায়েজিদ, শতদল বড়ুয়া, শহীদুজ্জামান সেলিম, ইব্রাহিম বিদ্যুৎ, শুভাশিস ভৌমিক, আহমেদ রুবেল, নাসরীন নাহার, রোজী সিদ্দিকী, সাইফুদ্দিন আহমেদসহ আরও অনেকে।

তিনি আরও জানান, ঢাকা থিয়েটারে এটাই তার প্রথম নির্দেশনা। ১৯৮৩ থেকে শুরু করে ২০২৫-এর ডিসেম্বরে এসে এই নাটকটিতে নির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। নাটকটির রচয়িতা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রুবাইয়াৎ আহমেদ। নাটকে তাদের দলের কিছু নবীন ও প্রবীণ নাট্যকর্মীর চমৎকার সমন্বয় রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিভাগে পড়াকালীন সময়ে ১৯৮০ সালে ফরীদি ভাই জাকসুর নির্বাচিত নাট্য সম্পাদক ছিলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে নাট্যকর্মী নেওয়া হবে। যাঁরা ইন্টারভিউতে উত্তীর্ণ হবে তাঁদের নিয়ে এক মাসের প্রশিক্ষণ কর্মশালার ব্যবস্থা করা হবে। কর্মশালা পরিচালনা করেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব সৈয়দ জামিল আহমেদ। ফারুক আহমেদ ওই নাট্য কর্মশালায় কাজ করার সুযোগ পান এবং মূলত সেখান থেকেই তার অভিনয়ের যাত্রা শুরু হয়।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) ‘বারো রকম মানুষ’ নাটকের ‘রসিক লাল’ চরিত্রটি তাকে রাতারাতি লাইমলাইটে নিয়ে এসেছিল। তবে চরিত্রটি তার কাছে খুব বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়নি কারণ রসিক লাল করার আগেই মঞ্চে তার প্রায় ৯-১০ বছরের অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল। ঢাকা থিয়েটারে ছিল নাসির উদ্দীন ইউসুফ ভাইদের মতো গুণী মানুষ। সেখানে যোগ্যতার একটা মাপকাঠি ছিল। মঞ্চে প্রায় এক দশক কাজ করার পর তাকে বলা হলো টেলিভিশনে অডিশন দিতে। প্রথমবার ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বার অডিশনে পাস করেন।

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল অনেক আগে। হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই আহসান হাবিব তার স্কুলের বন্ধু ছিল। তারা যখন মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট স্কুলে পড়তাম, তখন হুমায়ূন আহমেদের ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটি বের হয় এবং আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি হুমায়ূন আহমেদকে দেখার জন্য আহসান হাবিবের সাথে বাবর রোডের বাসায় যান। সেদিনই প্রথম তিনি হুমায়ূন আহমেদকে দেখেন ও তাঁর সাথে পরিচয় হয়।

৯০ দশকে হুমায়ূন আহমেদ যখন দেশে ফিরে নাটক লেখা এবং পরিচালনা শুরু করেন, তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক রিয়াজউদ্দিন বাদশা তাকে হুমায়ূন আহমেদের সাথে দেখা করার জন্য ডাকেন। হুমায়ূন আহমেদ তাকে তাঁর লেখা নাটকের একটি স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দেন এবং পড়তে বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি এবং একক অভিনয়ে কয়েকবার পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার রিডিং পড়ার দক্ষতা ভালো ছিল। তিনি যখন নাটকের স্ক্রিপ্টটি পড়ে শোনালেন, তাঁর রিডিং পড়া শুনে হুমায়ূন আহমেদ খুশি হন। এভাবেই তাঁর লেখার সাথে ‘অচিন বৃক্ষ’ নাটকের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়। এরপর ‘আজ রবিবার’, ‘মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে’সহ তাঁর নির্দেশনায় অনেক নাটকে কাজ করার সৌভাগ্য তার হয়েছে।

তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন কিংবদন্তি লেখক একটি বই তাকে উৎসর্গ করেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, উনি যে বইটি উৎসর্গ করবেন, তা তাকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেননি। বইমেলায় বইটি প্রকাশের পর একজন পাঠক ফোন করে অভিনন্দন জানানোর পর তিনি তা জানতে পারেন। বইটি ছিল ‘লিলুয়া বাতাস’। তিনি সাথে সাথে বইমেলা থেকে বইটি কিনে তাঁর বাসায় মিষ্টি আর ফুল নিয়ে হাজির হন।

বর্তমান সময়ের ওটিটি এবং ইউটিউব কেন্দ্রিক আধুনিক নাটকের গল্প নিয়ে তার মূল্যায়ন হলো, এখন অনেক ভালো কাজ হচ্ছে, ভালো ওয়েব সিরিজ হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি কিছু অন্যরকম কাজও হচ্ছে—যেখানে অহেতুক গালাগালি বা ভিউ পাওয়ার একটা সস্তা প্রতিযোগিতা দেখা যায়। ‘যেভাবেই হোক ভিউ পেতে হবে’ এমন চিন্তাভাবনা থেকে তৈরি নাটকগুলো সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

তবে তার মতে, আমাদের বড় সমস্যা হলো ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটারের অভাব। সেলিম আল দীন, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আল মামুন বা মামুনুর রশীদ ভাইদের মতো লেখক এখন কম। একটি ভালো নাটকের জন্য প্রথম শর্ত হলো একটি শক্তিশালী গল্প বা স্ক্রিপ্ট। এরপর অভিনেতা ও পরিচালকের কাজ। একজন ভালো লেখক হতে গেলে প্রচুর বই পড়া দরকার কিন্তু আমরা বই পড়ি না। শুধু নাটক বা চলচ্চিত্র দেখে কাজ করতে গেলে সেটা হয় অনুকরণ হয়—যেমন তামিল, ইংরেজি বা তুর্কি সিনেমা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই লেখার চেষ্টা করেন। সেখানে তাঁর নিজস্বতা থাকে না। বই পড়লে একজন লেখক নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারেন।

ভবিষ্যতে টেলিভিশনের জন্য বেশ কয়েকটি একক নাটক নির্মাণ করার ইচ্ছা তার আছে। তার নিজের লেখা কিছু স্ক্রিপ্ট তৈরি আছে। তার নির্দেশিত ‘রঙমহাল’ নিয়ে দর্শকদের মধ্যে যে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন, তা ধরে রেখে মঞ্চে আরও কাজ করার ইচ্ছা তার আছে।

লেখালেখির ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয়। তার লেখা চারটি বই বাজারে আছে। একটি নাটকের বই যেটির নাম ‘হাউমাউখাও’, একটি ‘স্মৃতিতে হুমায়ূন আহমেদ’, একটি ‘ভাঙা চশমা’, আরেকটি ‘আমার না বলা কথা’। ২০২৭ সালের বইমেলায় তার লেখা নতুন যে বইটি আসবে সেটির নাম ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’।