সব সংবাদ
খেলা

মিডফিল্ড ছেড়ে বিশ্বসেরা ডিফেন্ডার, মাঠের বাইরেও আলো জ্বেলেছেন কাফু

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কিংবদন্তি কাফু ১৯৭০ সালে সাও পাওলোর দরিদ্রতম এলাকা জার্দিম ইরেনে জন্মগ্রহণ করেন। মিডফিল্ডার থেকে রাইট-ব্যাকে রূপান্তরিত হয়ে তিনি টানা তিন বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার ইতিহাস রচনা করেন এবং ২০০২ সালে অধিনায়ক হিসেবে ব্রাজিলের পঞ্চম শিরোপা জয় করেন।

পুরো নাম মার্কোস ইভানজেলিস্তা ডি মোরাইস, কিন্তু কাফু নামেই তিনি ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ১৯৭০ সালে তার জন্ম হয়, ঠিক দুই সপ্তাহ পরই ব্রাজিল তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় করে। সাও পাওলোর দরিদ্রতম অঞ্চল জার্দিম ইরেনে তার শৈশব কাটে, যেখানের কঠিন রাস্তাঘাট তাকে হার না মানার শিক্ষা দিয়েছে। শৈশবে ডানপ্রান্তে খেলতেন তিনি। সাবেক ফুটবলার কাফুরিঙ্গার সঙ্গে খেলার ধরন মিলে যাওয়ায় কাফু ডাকনামটি পান। চেয়েছিলেন পালমেইরাস বা সান্তোসের মতো বড় ক্লাবে খেলতে, কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হয়ে ১৮ বছর বয়সে যোগ দেন সাও পাওলো এফসিতে।

রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা শুরু করলেও কিংবদন্তি কোচ টেলে সান্তানার অধীনে তিনি রাইট-ব্যাকে রূপান্তরিত হন। এটি ছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী কৌশলগত পরিবর্তন। সান্তানার অধীনে কাফুর ডান প্রান্ত দিয়ে দুরন্ত গতিতে উঠে যাওয়ার ক্ষমতা সাও পাওলোকে আক্রমণে বাড়তি শক্তি দেয়। ১৯৯০ সালে তিনি ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পান। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলিয়ান লিগের ফাইনালে সাও পাওলো পালমেইরাসকে ৪-২ গোলে হারায়, চারটি গোলেই অবদান ছিল কাফুর। এক সপ্তাহ পর তারা টোকিওতে বার্সেলোনাকে হারিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জিতে নেয়। ২৪ বছরে পা দেওয়ার আগেই কাফুর ঝুলিতে ছিল দুটি কোপা লিবার্তাদোরেস, দুটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ এবং প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রগামী ব্রাজিল দলে মাত্র ২৪ বছর বয়সী কাফু অভিজ্ঞ জর্জিনহোর ছায়াতেই ছিলেন। ইতালির বিপক্ষে ফাইনালের ২০ মিনিটে জর্জিনহো চোট পেলে তিনি মাঠে নামেন। ব্রাজিল ক্লিনশিট ধরে রাখে এবং টাইব্রেকারে ইতালিকে হারিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয় করে। বিশ্বকাপ জয়ের পর ইউরোপে তার প্রথম গন্তব্য হয় রিয়াল জারাগোজা। পরে ব্রাজিলের ছোট ক্লাব জুভেন্তুদে ফিরে মনোযোগ দেন ক্যারিয়ার পুনর্গঠনে। সেখান থেকে পালমেইরাসে যোগ দিয়ে জেতেন পোলিস্তা কাপ।

কাফু আবারও ইউরোপে ফেরেন ইতালির এএস রোমার জার্সিতে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়সূচক গোলে তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর ব্রাজিল ফাইনালে উঠে হেরে যায় জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে। ২০০১ সালে রোমা যখন সিরি আর শিরোপা জেতে, তাদের উইং-ব্যাকে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠেন কাফু।

২০০২ বিশ্বকাপে তিনি ব্রাজিলের অধিনায়কত্ব পান। কোচ লুই ফেলিপে সোলারির অধীনে ব্যাক-থ্রি কৌশলে উইং-ব্যাক হিসেবে দুর্দান্ত খেলেন। আর আক্রমণভাগে রোনালদিনহো, রোনালদো, রিভালদোদের নেতৃত্বে পঞ্চম শিরোপা জেতে সেলেসাওরা। ফাইনালে জার্মানিকে হারানোর পর কাফু ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার কীর্তি গড়েন। ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সময় তার জার্সিতে লেখা ছিল '১০০ পার্সেন্ট জার্দিম ইরেন'।

বিশ্বকাপের এক বছর পর কাফু যোগ দেন এসি মিলানে। ২০০৫ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠে নাটকীয়ভাবে হার দেখেন লিভারপুলের কাছে, দুই বছর পর তাদের হারিয়ে প্রতিশোধ এবং শিরোপা উৎসব করে মিলান। ফিলিপো ইনজাঘির জোড়া গোলে মিলান সপ্তম ইউরোপিয়ান শিরোপা জেতে এবং কাফু পূরণ করেন নিজের শেষ স্বপ্নটিও। ২০০৬ বিশ্বকাপেও তিনি ব্রাজিলের অধিনায়ক ছিলেন।

দীর্ঘদিন ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ (১৪২) খেলা ফুটবলার ছিলেন কাফু। ইতালিতে তিনি জিতেছেন দুটি সিরি আ, দুটি ইতালিয়ান সুপার কাপ, দুটি ইউরোপিয়ান সুপার কাপ এবং একটি ক্লাব বিশ্বকাপ। এ ছাড়া রোমা ও এসি মিলান উভয় ক্লাবেরই হল অব ফেমে জায়গা পেয়েছেন। মাঠের বাইরেও তিনি সমান অনুকরণীয়। জন্মস্থান জার্দিম ইরেনে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও পরিবারদের সহায়তার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন 'কাফু ফাউন্ডেশন'। যারা খেলাধুলা ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন জীবন গড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।