৪৮ দলের বিশ্বকাপে জটিল হিসাব: দ্বিতীয় হলে স্পেন-আর্জেন্টিনা, তৃতীয় হলে সহজ প্রতিপক্ষ?
২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাটে গ্রুপ পর্ব থেকে শেষ ৩২-এ যাওয়ার হিসাব অনেক জটিল হয়ে গেছে। গ্রুপের দ্বিতীয় স্থান পেলে সরাসরি কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু তৃতীয় স্থান পেলেও নকআউটে ওঠার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব এখনো চলছে, কিন্তু শেষ ৩২-এর ছবি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট এমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে কোনো কোনো দলের জন্য গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ার চেয়ে তৃতীয় হওয়া বেশি সুবিশাজনক হতে পারে।
১২টি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি শেষ ৩২-এ যাবে। সঙ্গে যাবে ১২ গ্রুপের সেরা আট তৃতীয় দল। অর্থাৎ গ্রুপে তৃতীয় হলেই বিদায় নয়, পর্যাপ্ত পয়েন্ট ও গোল ব্যবধান থাকলে তৃতীয় দলও নকআউটে উঠতে পারে। এখানেই জটিলতা—সেরা তৃতীয় দলের প্রতিপক্ষ কখনো কখনো গ্রুপের দ্বিতীয় দলের চেয়েও সহজ হতে পারে।
এই আলোচনার কেন্দ্রে আছে গ্রুপ 'এইচ' ও গ্রুপ 'জে'। গ্রুপ 'জে'-তে আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে। জর্ডান বিদায় নিয়েছে। বাকি লড়াই অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার মধ্যে। শেষ ম্যাচে অস্ট্রিয়া মুখোমুখি হবে আলজেরিয়ার। অস্ট্রিয়ার পয়েন্ট তিন, আলজেরিয়ারও তিন। গোল ব্যবধানে অস্ট্রিয়া এগিয়ে। তাই ড্র করলেই অস্ট্রিয়া দ্বিতীয় হবে। আলজেরিয়ার দ্বিতীয় হতে হলে জিততেই হবে।
কিন্তু এখানে অঙ্কটা সোজা নয়। গ্রুপ 'জে'-এর দ্বিতীয় দল শেষ ৩২-এ খেলবে গ্রুপ 'এইচ'-এর বিজয়ীর বিপক্ষে। সেই গ্রুপে আছে স্পেন। ইউরো চ্যাম্পিয়নরা এখন চার পয়েন্ট ও শক্তিশালী গোল ব্যবধানে শীর্ষে। উরুগুয়ের বিপক্ষে জিতলে তারা গ্রুপসেরা হবে।
অন্যদিকে গ্রুপ 'এইচ'-এর দ্বিতীয় দল খেলবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। অর্থাৎ এই দুই গ্রুপের দ্বিতীয় দলগুলোর জন্য সম্ভাব্য পুরস্কার খুব কঠিন—একদিকে স্পেন, অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে, গ্রুপ 'জে'-তে দ্বিতীয় হওয়ার চেয়ে তৃতীয় হয়ে সেরা তৃতীয় দলের একটি হিসেবে উঠলে পথ কি তুলনামূলক কম কঠিন হতে পারে? তৃতীয় হয়ে উঠলে অস্ট্রিয়া বা আলজেরিয়ার সামনে অন্য কোনো গ্রুপ বিজয়ী আসতে পারে। ব্র্যাকেটের সম্ভাব্য হিসাব অনুযায়ী, গ্রুপ 'জে'-এর তৃতীয় দল সেরা তৃতীয়দের একটি হলে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, গ্রুপ 'বি'-এর বিজয়ী কানাডা বা সুইজারল্যান্ড, গ্রুপ 'জি'-এর বিজয়ী মিসর, ইরান বা বেলজিয়াম, গ্রুপ 'এল'-এর বিজয়ী ইংল্যান্ড, ঘানা বা ক্রোয়েশিয়া, অথবা গ্রুপ 'কে'-এর বিজয়ী কলম্বিয়া বা পর্তুগাল। এর মধ্যে ইংল্যান্ড, পর্তুগাল বা কলম্বিয়া কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারে, কিন্তু স্পেনের সামনে সরাসরি পড়ার ঝুঁকিও এড়ানো যেতে পারে।
এখানেই নতুন ফরম্যাটের জটিলতা। খেলাধুলার স্বাভাবিক যুক্তিতে প্রতিটি দল জিততে চায়, যত ওপরে থাকা যায় তত ভালো। কিন্তু ব্র্যাকেটের বাস্তবতায় কখনো কখনো তৃতীয় হওয়াও কম কঠিন পথ খুলে দিতে পারে। তবে এটি কোনো দলের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে না জেতার সহজ যুক্তি নয়। কারণ তৃতীয় হয়ে ওঠা নিশ্চিত নয়। ১২ গ্রুপের তৃতীয় দলগুলোর মধ্যে শুধু সেরা আট দলই যাবে শেষ ৩২-এ। পয়েন্ট, গোল ব্যবধান, গোলসংখ্যা, শৃঙ্খলা স্কোর ও ফিফা র্যাংকিং মিলিয়ে অঙ্কটা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষ করে অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচে এই ঝুঁকি বড়। যে দল হারবে, সে হয়তো তৃতীয় থাকবে, কিন্তু সেরা তৃতীয় দলের তালিকায় থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। হার বড় হলে গোল ব্যবধান খারাপ হবে। অন্য গ্রুপের ফলও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে। তাই 'তৃতীয় হলেই সহজ পথ' বলা যাবে না।
এই কারণেই গ্রুপের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে হয়। ১৯৮২ বিশ্বকাপের বিখ্যাত গিজনের কলঙ্কের পর ফিফা এই নিয়ম চালু করে। তখন পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচের ফল দুই দলকেই সুবিধা দেয়, আর বাদ পড়ে আলজেরিয়া। সেই ঘটনার পর থেকেই একই গ্রুপের শেষ দুই ম্যাচ একসঙ্গে শুরু হয়, যাতে কোনো দল আগে থেকে ফল জেনে সুবিধা নিতে না পারে।
এখন পর্যন্ত মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও আর্জেন্টিনা গ্রুপসেরা হওয়া নিশ্চিত করেছে। ফ্রান্স ও নরওয়েও নকআউট নিশ্চিত করেছে। কলম্বিয়াও শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে হাইতি, তুরস্ক, তিউনিসিয়া, জর্ডান ও পানামার বিদায় নিশ্চিত।
বিশ্বকাপের সৌন্দর্য সাধারণত সরলতায়: জিতলে এগোনো, হারলে বিদায়। কিন্তু ৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপ সেই সরলতাকে জটিল করেছে। এখন শুধু পয়েন্ট টেবিল নয়, ব্র্যাকেট, তৃতীয় দলের র্যাংকিং, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ—সবকিছু মিলিয়ে হিসাব করতে হচ্ছে। অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচ তাই শুধু দ্বিতীয় স্থান নির্ধারণের লড়াই নয়, নতুন বিশ্বকাপ ফরম্যাটের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটির পরীক্ষা।