চৈতালী চক্রবর্তীর রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্য: আইনি পদক্ষেপ কবে?
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী চৈতালী চক্রবর্তীর কিছু বিতর্কিত ভিডিও সাক্ষাৎকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও আইনি বিতর্কের ঝড় উঠেছে। তার বক্তব্যে দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চৈতালী চক্রবর্তীর কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য চৈতালী চক্রবর্তী ২০১৬ সালের ২২ মে এই সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি বিগত স্বৈরাচারী শাসক গোষ্ঠীর মহিলা আওয়ামী লীগের একজন উগ্র সমর্থক বলে পরিচিত।
গত শুক্রবার (১৯ জুন) গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে চৈতালী চক্রবর্তীকে বলতে শোনা যায়, 'এই বাংলাদেশ আমার। আদি বাংলাদেশও আমার। আপনারা বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য চেয়ে আমরা সনাতনীদের জন্য আলাদা একটি প্রদেশ করব।' তিনি আরও বলেন, 'এক সময় কিন্তু এরকমই হবে, সনাতনীদের আলাদা একটি প্রদেশ হয়ে যাবে।'
এছাড়াও তিনি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় রীতিনীতিকে কটাক্ষ করে রাস্তায় নামাজ পড়া নিয়ে উস্কানিমূলক কথা বলেন এবং দাঙ্গা বাধানোর উস্কানি দিয়ে বলেন, 'আপনাকেরা দুইটা মারবেন, আমরা একটা মারব। কিন্তু আমরাও মারব।' তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আপত্তিকর ভাষায় আক্রমণ করেন এবং দাবি করেন, এই সরকার পরিকল্পনা করেই বাংলাদেশে সনাতনী সম্প্রদায়কে ধ্বংস করতে এসেছিল।
তিনি নিজেকে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার অন্ধ ভক্ত দাবি করে বলেন, 'জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন বলেছেন, তিনি ফিরবেন, তখন তিনি অবশ্যই ফিরবেন। কারণ শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশ।' তিনি 'জুলাই বিপ্লব'-কে কটাক্ষ করে বলেন, 'জুলাই জুলাই বললেই গণধোলাই হবে, সেই দিন চলে আসছে।'
একই সাথে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের একক অবদান দাবি করে বলেন, 'আমরা আজকে বাংলাদেশ পেয়েছি এটা ভারতের অবদান এটা স্বীকার করতেই হবে। তাই ভারতের সম্পর্কে আমরা সরাসরি ভারতকে সাপোর্ট করি কারণ ভারত থেকে আমরা সহযোগিতা পেয়েছি।'
বিশ্লেষকদের মতে, চৈতালী চক্রবর্তীর এই বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে ভারতের কট্টরপন্থী থিংক ট্যাঙ্ক এবং গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর দীর্ঘদিনের গোপন মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে চাচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বা একটি বিস্তীর্ণ অংশকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা হিন্দু রাজ্য তৈরি করতে, যাতে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। চৈতালী চক্রবর্তীর মুখ দিয়ে মূলত ভারতের সেই গোপন এজেন্ডারই অঘোষিত ট্রেইলার প্রকাশ পেয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো দেশে যদি কোনো সংখ্যালঘু নেতা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বিদেশের সাহায্য নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র বা প্রদেশ গঠনের হুমকি দিতেন, তাহলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেফতার করা হতো। অথচ বাংলাদেশে দণ্ডবিধির ১২৩ (ক) এবং ১২৪ (ক) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে—কোনো নাগরিক যদি স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ছিন্নভিন্ন করার কথা বলেন, আলাদা প্রদেশের দাবি তোলেন, কিংবা দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানান, তবে তা 'হাই ট্রিজন' বা চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড।
দেশজুড়ে এখন তীব্র ক্ষোভ আর একটাই প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি তার মেরুদণ্ড সোজা করে এই প্রকাশ্য রাষ্ট্রদ্রোহীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি পদক্ষেপ (মামলা ও গ্রেফতার) গ্রহণ করবে, নাকি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার জুজুর ভয়ে এই ভয়ঙ্কর অপরাধীকে ছাড় দিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়া হবে?