সংসদে বাজেট আলোচনায় শেখ হাসিনার বিচার দাবি, ৫৮ দেশের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি ও রেমিট্যান্সে রেকর্ড
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় বিরোধী ও সরকারি দলের সদস্যরা শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম, গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি এবং চা বাগানের শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিও উঠেছে। অর্থনীতির দুই প্রধান সূচকে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে - একদিকে ৫৮টি দেশের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি, অন্যদিকে রেকর্ড রেমিট্যান্স।
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী ও সরকারি দলের সদস্যরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম, বিগত আমলের গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি এবং দেশের চা বাগানগুলোর শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিও উঠেছে সংসদ অধিবেশনে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সংসদকে জানান, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্বের ৫৮টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দেশের এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি মূলত গুটিকয়েক প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যেই বেশি ঘনীভূত। শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, জ্বালানি পণ্য এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে আমদানির ওপর কাঠামোগত নির্ভরশীলতার কারণেই এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে চীনের সঙ্গে, যার পরিমাণ ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চীন থেকে ভারী যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী পণ্যের উচ্চ আমদানির বিপরীতে ওই অর্থবছরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য ঘাটতির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার এবং মালয়েশিয়ার সঙ্গে ২ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে কাতারের সঙ্গে ২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। ইউরোপের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের সঙ্গে ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে দেশের।
বাণিজ্য ঘাটতির এই উদ্বেগজনক চিত্রের বিপরীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সংসদে এক স্বস্তিদায়ক খবর দেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় অর্জন করেছে। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই অবদান অনন্য। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যার পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরব থেকে ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৪ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে।
অর্থনীতির এই খতিয়ানের পাশাপাশি সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষোভ ও মাঠপর্যায়ের নানা সংকটের কথা তুলে ধরেন সংসদ সদস্যরা। কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল গফুর বর্তমান প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে উল্লেখ করলেও একে অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী এবং অবাস্তবায়নযোগ্য বলে সমালোচনা করেন।
বাজেটে সুশাসনের চরম অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হলেও আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী তা মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হবে, যা অর্জন করা অসম্ভব। আব্দুল গফুর শিক্ষাখাতে ১৪ হাজার কোটি টাকার হিসাব মিলছে না বলে অভিযোগ তোলেন এবং তার নির্বাচনী এলাকার স্কুল-কলেজের জরাজীর্ণ ভবনের চিত্র তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনের বেহাল দশা।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তির দাবি তুলে অত্যন্ত কঠোর বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহেনা আক্তার রানু। তিনি দাবি করেন, অতীতে যে 'আয়নাঘরে' বিরোধী দলের নেতাদের বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সেই একই চেয়ারে বসিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া উচিত।
সংসদে গ্রামীণ অবকাঠামোর অনিয়ম নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি জানান, বিগত সরকারের শাসনামলে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের কর্মসূচির নামে টিআর, কাবিটা ও কাবিখা বরাদ্দ নিয়ে যে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তার তদন্ত চলছে।
অধিবেশনের শেষভাগে দেশের চা বাগানগুলোর শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে আসে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্ডকার আবদুল মুক্তাদির জানান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর (এনএসআই) চা বাগানে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরিকে কেন্দ্র করে শ্রম অসন্তোষ সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দেশের ৩১টি চা বাগানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এদিকে, ভূমিকম্পসহ নগর দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস ও বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ৪৪৫টি ভূমিকম্পের নিরাপদ আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করা হয়েছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যার বিচারকাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে বলে জাতীয় সংসদে গভীর ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন জুলাই শহীদের মাতা ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম। তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যার ৮০টি মামলা করা হলেও গত দুই বছরে মাত্র সাতটি মামলার রায় হয়েছে। ৪৬৩ জন আসামির মধ্যে এখনও ২৮৮ জন পলাতক রয়েছে।