পলাশী যুদ্ধের ২৬৯ বছর: ইতিহাসের ছায়া আজও কি আমাদের রাজনীতিকে তাড়া করছে?
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত এক ঘণ্টার প্রহসনের যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা হারিয়ে যায়। বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের সহযোগিতায় রবার্ট ক্লাইভের মাত্র তিন হাজার ২০০ সৈন্যের কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৫০ হাজার সৈন্য পরাজিত হয়। আজ, ২৬৯ বছর পরেও প্রশ্ন উঠছে—পলাশী ট্র্যাজেডির ছায়া কি আমাদের রাজনীতিতে এখনো সক্রিয়?
আজ ২৩ জুন। বাংলার ইতিহাসের এক কালো দিনের স্মৃতি ফিরে আসে প্রতি বছর। এই দিনটিতে ১৭৫৭ সালে পলাশীর মাঠে ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। সেদিন মাত্র এক ঘণ্টার যুদ্ধে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। এই পরাজয় ছিল আসলে ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের সূচনা।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল মাত্র ২২ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাঁর শাসনামল শুরু হওয়ার আগেই ইংরেজদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। একই সময়ে তাঁর পিতামহ আলীবর্দী খাঁর বিশ্বস্ত অনুচর মীর জাফর ও ঘষেটি বেগম ইংরেজদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতা পরিষদ নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
২৩ জুন সকালে পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। মীরমদনের নেতৃত্বে নবাবের সৈন্যরা শুরুতে ইংরেজদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং সফলও হন। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লতিফ ও রায়দুর্লভ তাদের সৈন্য নিয়ে নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। দুপুরে বৃষ্টি শুরু হলে নবাবের গোলাবারুদ ভিজে যায়। যুদ্ধ চলাকালে বীর মীরমদন মারা যান। এরপর মীর জাফর সৈন্যদের পিছু হটার নির্দেশ দেন এবং ইংরেজরা নবাবের ছাউনি দখল করে নেয়।
যুদ্ধ শেষ হয় বিকেল পাঁচটায়। নবাব পালিয়ে মুর্শিদাবাদে যান, কিন্তু কেউ তাঁকে সাহায্য করেনি। ৩ জুলাই তিনি বন্দী হন এবং ৪ জুলাই মীরজাফরের নির্দেশে হত্যা করা হয়। মুর্শিদাবাদে নবাব আলিবর্দী খানের কবরের পাশে তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়।
অবাক করার বিষয় হলো, ৫০ হাজার সৈন্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে মাত্র তিন হাজার ২০০ জনের বাহিনীর কাছে পরাজয় হলো? ইতিহাসবিদরা বলেন, এই পরাজয়ের মূল কারণ ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। পরবর্তীতে কাটোয়া, গিরিয়ার যুদ্ধে বা ফকির-মজনুর আন্দোলনেও এই সৈন্যদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ দেখা যায়নি।
আজ, ২৬৯ বছর পরেও প্রশ্ন উঠছে—পলাশী ট্র্যাজেডির ছায়া কি আমাদের রাজনীতিতে এখনো বিদ্যমান? ইতিহাস বলছে, দেশের ভেতরের শত্রু বাইরের শত্রুর চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর। স্বাধীনতা একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং দেশপ্রেম সবচেয়ে বড় আমানত। এই শিক্ষা যেন আমরা ভুলে না যাই।