সব সংবাদ
অন্যান্য

হিজরি ক্যালেন্ডারের ইতিহাস: কীভাবে মুসলিমদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জির জন্ম হয়েছিল

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর আমলে প্রশাসনিক সংকটের সমাধানে সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে হিজরতের বছরকে ভিত্তি করে মুসলিমদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করা হয়। মুহাররম মাস থেকে এই সনের গণনা শুরু হয়।

প্রতিটি জাতির নিজস্ব পরিচয় ও ইতিহাসের অন্যতম ভিত্তি তার বর্ষপঞ্জি। মুসলিম উম্মাহর ক্ষেত্রেও এটি সত্য। আজ বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান হিজরি সন অনুসরণ করে ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, যার পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যের এক গৌরবময় ইতিহাস।

ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে কোনো নির্দিষ্ট সাল গণনা পদ্ধতি ছিল না। মানুষ সাধারণত কোনো বড় ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে বছরকে চিহ্নিত করত। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবছরকে 'আমুল ফীল' বা হস্তীবাহিনীর বছর বলা হতো। ইসলামের বিস্তারের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। যখন ইসলাম আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে বৃহৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিণত হয়, তখন একটি সুনির্দিষ্ট বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে ওঠে।

হজরত ওমর (রা.) খিলাফতের যুগে ইরাকের গভর্নর ছিলেন হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)। তিনি লক্ষ্য করেন, মদিনা থেকে আসা সরকারি ফরমান ও চিঠিপত্রে কোনো তারিখ উল্লেখ করা হয় না। ফলে কোন নির্দেশ আগে এসেছে এবং কোনটি পরে কার্যকর করতে হবে—তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান।

বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে হজরত ওমর (রা.) মদিনার শীর্ষ সাহাবিদের নিয়ে একটি বিশেষ পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন হজরত উসমান (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত তালহা (রা.), হজরত যুবায়ের (রা.) এবং হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-সহ আরও অনেকে। সভায় বিভিন্ন মতামত উঠে আসে। কেউ রোমানদের বর্ষপঞ্জি অনুসরণের প্রস্তাব দেন, কেউ পারসিক বা ইহুদি পঞ্জিকার কথা বলেন। কিন্তু হজরত ওমর (রা.) দৃঢ়ভাবে বলেন, মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব পরিচয় ও স্বকীয়তা থাকা প্রয়োজন।

নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের সিদ্ধান্তের পর প্রশ্ন ওঠে—এর গণনা কোন ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে শুরু হবে? কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবছর, কেউ নবুয়তপ্রাপ্তির বছর, আবার কেউ তাঁর ইন্তেকালের বছরকে ভিত্তি করার প্রস্তাব দেন। এ সময় হজরত আলী (রা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতের পঞ্চম বছরে একটি চুক্তিপত্রে 'হিজরতের পঞ্চম বছর' উল্লেখ করেছিলেন। সুতরাং মুসলিম রাষ্ট্রের ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হওয়া হিজরতকেই বর্ষপঞ্জির ভিত্তি করা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত হবে। তার এই মতামত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত শুধু ভৌগোলিক স্থানান্তর ছিল না; এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—'যারা নির্যাতিত হওয়ার পর আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম অবস্থান দান করব।' (সুরা আন-নাহল: আয়াত ৪১) হিজরতের মাধ্যমেই ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, মুসলিম সমাজ স্বাধীন পরিচয় লাভ করে।

হিজরতের বছরকে ভিত্তি করার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—বছরের প্রথম মাস কোনটি হবে? কেউ রবিউল আউয়াল মাসের প্রস্তাব করেন, কারণ এ মাসেই রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় পৌঁছেছিলেন। আবার কেউ রমজান মাসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। এ সময় হজরত উসমান (রা.) মত দেন যে মুহাররম মাস থেকেই বছর শুরু হওয়া উচিত। কারণ হিজরতের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সূচনা হয়েছিল মুহাররমেই। হজরত আলী (রা.)-ও এই মত সমর্থন করেন। অবশেষে হজরত ওমর (রা.) ঘোষণা দেন—'মুসলিমদের নতুন বর্ষপঞ্জি হিজরত থেকে গণনা শুরু হবে এবং মুহাররম হবে বছরের প্রথম মাস।'

মুহাররমকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—'রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।' (মুসলিম ১১৬৩) এ কারণেই হিজরি বর্ষের সূচনা মুহাররম মাস দিয়ে হওয়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

হিজরি সনের প্রবর্তন শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন পূরণ করেনি; বরং মুসলিম জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয়ও প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি মুসলিমদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে তাদের ইতিহাসের মোড় ঘুরেছিল হিজরতের মাধ্যমে—ত্যাগ, সংগ্রাম, ঈমান ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার এক অনন্য অধ্যায়ের মাধ্যমে। সাহাবায়ে কেরামের দূরদর্শিতা এবং হজরত ওমর (রা.)-এর নেতৃত্বে গৃহীত সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আজও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও পরিচয়ের প্রতীক হয়ে আছে।